সিপিডির সংলাপ

জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষের প্রয়োজন নেই

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৫১ এএম

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তনের প্রয়োজন নেই বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হলে সেটি আইন প্রণয়নসহ রাষ্ট্র পরিচলনার ক্ষেত্রে আরও বেশি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছে সিপিডি।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে সিপিডি ‘প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ কি জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবে’ শিরোনামে এক জাতীয় সংলাপ আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের অংশগ্রহণে সেই অনুষ্ঠানে সংসদ দ্বিকক্ষ করার প্রস্তাব বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এককক্ষ ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সংসদীয় জবাবদিহির পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে এ পরামর্শ দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থাটি। তারা মনে করছে, বর্তমান ব্যবস্থায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় কাঠামো চালু করলেও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাবে না।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য প্রতিষ্ঠায় গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেই কমিশন ধারাবাহিক বৈঠকের পর গত বুধবার জানায়, তারা দু-এক দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। এ প্রতিবেদনে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের কথা থাকছে। কারণ, দলগুলো এতে একমত হয়েছে বলে আগেই জানানো হয়।

কমিশনের প্রতিবেদন দেওয়ার ঠিক আগে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সংসদে জবাবদিহির পদ্ধতি, সংসদীয় ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে বৈশ্বিক উদাহরণগুলো বিশ্লেষণ করে গতকালের সংলাপে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উত্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক নিজাম আহমদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. রওনক জাহান। তিনিও মনে করেন, যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা জটিলতা বাড়াবে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০২৪ সালে যখন বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তরণ ঘটেছে, তখন যে চাহিদাটা ছিল জনগণের কাছ থেকে, সেটা হলো সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের জবাবদিহি যেন নিশ্চিত হয়। তার মাধ্যমে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ হবে। দেশে গত ৫০ বছরে ওয়েস্ট মিনস্টার সিস্টেম ঠিকভাবে কাজ করেনি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ওয়েস্ট মিনস্টার সিস্টেম আসলে সঠিকভাবে এটি ফাংশন করে না।’

উদাহরণ দিয়ে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিভিন্ন সময় আমাদের এখানে ছোট ছোট সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন কমিটি ফর্ম করা হয়েছে। কমিটিগুলোর দায়িত্ববিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনা হয়েছে। কিন্তু তারপরও দেখা গেছে, কাজের কাজ হয়নি।’

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের ধারণার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ মন্তব্য করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ১৮৬২ সালের বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল থেকে শুরু করে ১৯৭২ সালের সংবিধান পর্যন্ত এ ভূখ- একটি ভাষা ও সংস্কৃতিগতভাবে একক ও সমজাতীয় সমাজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তাই ঐতিহাসিকভাবে একক সংসদই এখানে প্রাসঙ্গিক ছিল।

বাংলাদেশে সংসদের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এটি আইন প্রণয়নের আসল ক্ষেত্র না হয়ে শুধু আইন পাসের স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার সংসদে বেসরকারি বিল পাস করার সুযোগ থাকলেও সেটি রাজনৈতিক বাধা, দলীয় চাপ ও জটিল সংসদীয় প্রক্রিয়ার কারণে করা যায় না। এ অবস্থার পেছনে রাজনৈতিক বাধা, দলীয় চাপ এবং জটিল সংসদীয় প্রক্রিয়া দায়ী। এমনকি যখন বিল সংসদে যায়, কমিটিতে তা রেফার হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংশোধন সীমিত থাকে শব্দ বা অনুচ্ছেদ বদলের মধ্যেই গুণগত আলোচনা অনুপস্থিত থাকে।

তদারকির দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সংসদীয় তদারকি হওয়ার কথা তিনটি স্তরে আইন প্রণয়ন, বাজেট ও সাধারণ তদারকি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র; সেখানে নির্বাচিত প্রশ্নগুলোই আসে, সমালোচনামূলক আলোচনা নয়। সংসদের ৫০টির বেশি কমিটি থাকলেও নিয়মিত বৈঠক হয় না; পাঁচ বছরে প্রয়োজনীয় তিন হাজার বৈঠকের বিপরীতে বছরে গড়ে ১২টি বৈঠক হয়েছে। ফলে কার্যকর জবাবদিহি গড়ে ওঠে না। এ দুর্বল কাঠামোর মধ্যে দ্বিকক্ষের মতো নতুন কোনো সংসদীয় কাঠামো চালু করলেও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না বলে মনে করেন তিনি।

সংলাপে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে শেখ হাসিনা ‘দানবে’ পরিণত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে উচ্চকক্ষ থাকলে এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকলে বিএনপি কমপক্ষে ৯৩টি সংসদীয় আসন পেত। আওয়ামী লীগ পেত ১৪৪টির মতো। যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হলো, উচ্চকক্ষ থাকলে সেটি পাস করা কঠিন হতো।

অন্যদিকে উচ্চকক্ষ ফাংশনাল হলে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি কমবে বলে মন্তব্য করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘দেশে রাজনীতির মাঠে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি হয়। আমার ধারণা, যদি উচ্চকক্ষকে ফাংশনাল করা সম্ভব হয় তাহলে মাঠে এই যে অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচি আছে, সেটার সংখ্যা কমে আসতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চকক্ষে পলিসি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যারা সরকারি দলে থাকবেন তাদের যথেষ্ট ভাবার পরিবেশ তৈরি করবে। আমাদের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তনের জায়গা তৈরি হতে পারে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত