চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত ট্যারিফ বা শুল্ক স্থগিত করার দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। ‘অস্বাভাবিক’ ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রতিবাদে গতকাল রবিবার দুপুরে চট্টগ্রামের র্যাডিসন ব্লু বে-ভিউতে ব্যবসায়ীদের সমন্বয় সভায় বক্তারা এ দাবি করেন। বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনা না করা পর্যন্ত এ ট্যারিফ স্থগিত করার দাবি জানানো হয়। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৪০ বছর পর এ ট্যারিফ বাড়ানো হয়েছে। কাজেই এটি স্থগিত করার সুযোগ নেই। গতকাল রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘সমুদ্রগামী জাহাজ শিল্পের বিনিয়োগ সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌপরিবহন সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ এমন মন্তব্য করেন।
চট্টগ্রামের র্যাডিসন ব্লু বে-ভিউতে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী। চট্টগ্রামের সর্বস্তরের ব্যবসায়ীদের ব্যানারে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম, চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি এসএম আবু তৈয়বের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন এশিয়ান গ্রুপের প্রধান এমএ সালাম। এতে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক, বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি সেলিম রহমান, মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহসভাপতি এএম মাহবুব চৌধুরী, শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন, বিজিপিএমইএর সহসভাপতি শহীদুল্লাহ চৌধুরী, বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি নাসিরউদ্দিন চৌধুরী, বেপজার সিনিয়র সহসভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীরসহ ব্যবসায়ী নেতারা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ২০০৩ সালে বাফার সঙ্গে গার্মেন্টসের যখন সমস্যা হয়েছিল তখন আমি চেম্বারের সভাপতি ছিলাম। বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ একসঙ্গে প্রতিরোধ করতে পেরেছিলাম। এবার বন্দরের নতুন ট্যারিফ সাধারণ মানুষকে দিতে হবে। বন্দর নিয়ে যে খেলা শুরু হয়েছে, তা খেলতে দেওয়া হবে না। বন্দরে চট্টগ্রাম চেম্বার থেকে একজন প্রতিনিধিকে পরিচালক করতে হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বন্দরের মাশুল ব্যবসায়ীরা পেমেন্ট করবে না। এটা জনগণকে পেমেন্ট করতে হবে। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে স্বাধীন পরিচালক আছে, বন্দরে নেই কেন? আমরা কারও গোলাম না। আমার টাকায় আপনারা (বন্দর) চালান। ট্যারিফ বাড়ানো ষড়যন্ত্র। মোংলা, পায়রায় বাড়াননি। আমি ৪০ বছর ব্যবসা করছি। কচি খোকা নই। বন্দরকে বাঁচাতে হবে।
বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, আরএমজি সেক্টরের ব্যবসায়ীরা বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি দুটোই করে। ভিয়েতনাম, ভারত ও মালয়েশিয়ার চেয়ে আমাদের কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বেশি। ২৯ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতায় বন্দরকে লস করতে দেখিনি। তাহলে বন্দরে ৪১ শতাংশ ট্যারিফ কেন বাড়াতে হবে?
মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহসভাপতি এএম মাহবুব চৌধুরী বলেন, আমরা ট্যারিফ বাড়ানোর বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম বন্দর জনগণের টাকায় তৈরি সেবার জন্য। ২০২৩ সালের বন্দর আইনে উপদেষ্টা পরিষদ বাতিল করেছে। স্বাধীনতার সময় বন্দরে কাঁটাতারের বেড়া ছিল। পৃথিবীতে সাড়ে চার হাজার বন্দর আছে। আড়াই হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। বাড়াতে হলে জাতীয় সংসদ বাড়াবে।
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, দেশে প্রধান বন্দর নদীনির্ভর। বন্দরের মাশুল বাড়ানো নিয়ে আমাদের ক্ষোভ আছে। আমরা বলেছি সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বাড়াতে। ১৯৮৬ সালে ডলার ছিল ৩০ টাকা। এখন ডলারের দাম চারগুণ বেড়েছে। শিপিং এজেন্ট ফ্রেইট বাড়িয়েছে। ৪১ শতাংশের মধ্যে শুভংকরের ফাঁকি আছে। ২০ ফুটের কনটেইনারে ১২-১৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হবে। আমরা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ চাই, আমরা স্বনির্ভর দেশ গড়ে দেব।
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিপিং এজেন্ট ফি বাড়াবে। ভিয়েতনামের তিনগুণ খরচ হবে চট্টগ্রাম বন্দরে। আজকের দিনে ব্যবসায়ীদের পক্ষে কথা বলার কোনো সংগঠন নেই। ব্যবসায়ী সমাজ বিচ্ছিন্ন, হতাশাগ্রস্ত। সরকারি আমলারা এখন চট্টগ্রাম চেম্বার চালাচ্ছেন। দেশের অর্থনীতি, রাষ্ট্র ও ব্যবসায়ীদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
অন্যদিকে ইআরএফ মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে নৌপরিবহন সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ১৯৮৬ সালের পর এ বছর চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারে মাশুল বাড়ানো হয়েছে। গত প্রায় ৪০ বছরে মাশুল বাড়ানো হয়নি। তাই এ মাশুল কমানোর সুযোগ নেই। তিনি বলেন, পাঁচ বছর পরপর এটা বাড়ানো উচিত ছিল। ইআরএফের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি দৌলত আক্তার। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সমুদ্রগামী জাহাজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আজম জে চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
নৌপরিবহন সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যে এ নিয়োগ হয়ে যাবে। তাদেরও মুনাফার বিষয় আছে। তাই মাশুল কমানোর সুযোগ নেই। সমীক্ষার ভিত্তিতে এ মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এই হার একটু বেশি।’
বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে নৌপরিবহন সচিব বললেন, ‘চট্টগ্রামসহ তিনটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ২০ থেকে ৩০ বছরের জন্য এ অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হবে। এসব টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়িয়ে লিড টাইম কমিয়ে আনতে বিদেশি অপারেটর ছাড়া উপায় নেই। এসব চুক্তি প্রয়োজনে আমরা ওয়েবসাইটে দিয়ে দেব।’ ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশেই এমন বিদেশি অপারেটর আছে বলে জানান তিনি।
আজম জে চৌধুরী বলেন, সমুদ্রগামী জাহাজ খাতে বিনিয়োগে কর অবকাশ দেওয়া ছিল ২০৩০ সাল পর্যন্ত। এ কারণে বাংলাদেশি জাহাজের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার এই কর অবকাশ বাতিল করেছে। ফলে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জে পড়েছে। এই কর অবকাশ পুনর্বহালের দাবি জানান তিনি।
এর আগে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, পোশাক খাতের বাইরে চার-পাঁচটি খাত এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি করে। ভবিষ্যতে জাহাজ নির্মাণশিল্প এক বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। সেজন্য ব্যাংক গ্যারান্টিসহ অর্থায়নের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
