হ্যাল্লো কিশোর বন্ধুরা আমি কিশোর পাশা বলছি আমেরিকার রকি বীচ থেকে। জায়গাটা লস অ্যাঞ্জেলসে, প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে। হলিউড থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে। যারা এখনো আমাদের পরিচয় জানো না, তাদের বলছি আমরা তিন বন্ধু একটা গোয়েন্দা সংস্থা খুলেছি। নাম তিন গোয়েন্দা।
এভাবেই শুরু হতো সেবা প্রকাশনীর বিখ্যাত গোয়েন্দা সিরিজ তিন গোয়েন্দার গল্পগুলো। আমরা বড় হয়েছি তিন গোয়েন্দা পড়ে। নব্বই দশক জুড়ে যারা শৈশব কাটিয়েছি তাদের কেইবা টিফিনের টাকা জমিয়ে তিন গোয়েন্দা কিনে বন্ধুদের সঙ্গে কে আগে পড়বে সিরিয়াল নিয়ে মারামারি করে তিন গোয়েন্দা পড়েনি!
সেবা থেকে এলাকার লাইব্রেরিতে বা বাজারে তিন গোয়েন্দার নতুন বই আসা মানেই ছিল নতুন এক রোমাঞ্চের সন্ধান আর আমাদের অপেক্ষার পালা শেষ হওয়া। সেই অমৃতপান করেই আমাদের কৈশোর ছিল ঝলমলে, কচি লাউয়ের ডগার মতো সবুজ, বুদ্ধিদীপ্ত নানা দুষ্টুমিতে ভরা। আমি অন্তত দশটা তিন গোয়েন্দা গ্রুপের কথা জানি, যারা নিজেরা নিজেরা কিশোর মুসা রবিন হতে চেয়েছিল। গোলাপি মুক্তা, কালোহাত, প্রেতসাধনা, সাগরসৈকত, মূর্তির হুঙ্কার, চিতা নিরুদ্দেশ, কাকাতুয়া রহস্য, রতœদানো, কঙ্কাল দ্বীপ, গুহামানব, সবুজ ভূত একটার পর একটা বই অন্তহীন আনন্দের উৎস হয়ে এসেছিল আমাদের কিশোরবেলাকে রাঙিয়ে দিতে। সবকিছুর পেছনে রহস্যময় এক মানুষ রকিব হাসান।
মাঝে মাঝে মনে হয় অবিশ্বাস্য রকমের ভাগ্যবান একটা প্রজন্ম আমরা। বড় হয়েছি সেবার বই পড়ে। এর চেয়ে নির্মল আর পূর্ণতায় ভরা শৈশব-কৈশোর কল্পনাও করা যায় না। রকিব হাসানের সঙ্গে বছর কয়েক আগে এক বইমেলায় পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সেবারই আরেক প্রয়াত লেখক শেখ আবদুল হাকিম। রোগে-শোকে ন্যুব্জ একজন মানুষ। জীবনের সংগ্রাম সেই মানুষটির চেহারা ভরে দিয়েছে বিষণœতায়। তার সেই বিষণœমুখ ছাপিয়ে আমার চোখে ভেসে উঠল তাকে দেখে কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ডের মুখগুলো। এক লহমায় যেন ফিরে এলো আমার হারানো শৈশব। না তিনি আমাকে বিখ্যাত ইন্টারভিউয়ার বলে সাব্যস্ত করলেও আমাকে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হলেন না, অনেক অপ্রিয় প্রসঙ্গে কথা বলতে হবে মনে করে, তখন সেবা প্রকাশনী আর কাজী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করবেন এমন প্রস্তুতি হয়তো চলছিল। আমরা মেলার প্রান্তে গিয়ে চা খেলাম, তার কিডনি জটিলতার কথা শুনলাম। বুঝলাম তার কথা শুনতে শুনতেই, যিনি আমাদের শৈশব-কৈশোরের নিত্যসঙ্গী ছিলেন, অথচ নিজে কী ভীষণ প্রচারবিমুখ। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রহস্যময় থাকতেই কী এই প্রচারবিমুখতা? রকিব ভাই হাসলেন, ঠোঁট বাম দিকে বাঁকা করে পৃথিবী তাচ্ছিল্য করে দেওয়া এক হাসি। একজন লেখকের আত্মমর্যাদা আর মাথা নত করব না-মার্কা এক নিজস্বতার স্বাক্ষর যেন সেই হাসি।
বাংলাদেশের কিশোর আর যুবা কিংবা ইয়াং অ্যাডাল্টসদের জন্য কিশোর মুসা রবিনদের রেখে ১৫ অক্টোবর দুপুরের একটু আগে ডায়ালাইসিস নিতে নিতেই ধানম-ির একটি হাসপাতালে মারা গেলেন রকিব হাসান, যিনি শুধু একটি নাম নন, একটি প্রতিষ্ঠান, বাংলা কিশোর সাহিত্যের এক যুগস্রষ্টা। তার চলে যাওয়াকে তাই বলা যাবে যুগাবসান।
১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া এই লেখকের শৈশব কেটেছে ফেনীতে। বাবা সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় তার ছোটবেলা কেটেছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে ঘুরে। স্কুলে যেতে তার ভালো লাগত না, পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গল্পের বই বেশি টানত। ক্লাস এইটে পড়ার সময়ই তিনি লিখে ফেলেছিলেন ‘ডাকু মনসুর’। যদিও সেই পা-ুলিপি হারিয়ে যায়। পড়ালেখার প্রতি অনাগ্রহী হলেও বই পড়ার নেশা ছিল প্রবল। শরৎচন্দ্র থেকে নীহাররঞ্জন গুপ্ত, দস্যু বাহরাম থেকে টারজান সবই তার পড়া।
জীবনের শুরুতে তিনি বিভিন্ন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু কোথাও টিকতে পারেননি। ১২-১৩টি চাকরি বদল করেছেন। শেষে লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। সেবা প্রকাশনীতে তার যাত্রা শুরু হয় শেখ আবদুল হাকিমের সঙ্গে বইয়ের দোকানে ঘটা এক হঠাৎ সাক্ষাতের পর। পুরনো বইয়ের দোকানে হাকিম সাহেবের সঙ্গে আলাপ, তারপর কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে দেখা করা এভাবেই শুরু হয় রকিব হাসানের লেখক জীবন। প্রথমে মাসুদ রানা লিখেছেন, পরে তিন গোয়েন্দা থেকেই নিজের নামে অর্থাৎ রকিব হাসান নামে লেখা শুরু করেন।
তার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যে আসে তিন গোয়েন্দা। রবার্ট আর্থারের ‘থ্রি ইনভেস্টিগেটরস’ পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কাজী আনোয়ার হোসেনের তত্ত্বাবধানে তৈরি করেন কিশোর-মুসা-রবিনকে। তিনটি চরিত্রকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন তিনি একজন বুদ্ধি খাটাবে, একজন শক্তিতে পারদর্শী হবে, আরেকজনের মাথায় থাকবে সব তথ্য। এই তিনজন মিলে হয়ে উঠবে একজন পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা।
তিন গোয়েন্দা শুধু গোয়েন্দা কাহিনি নয়, এটি ছিল আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের হাতিয়ার। কীভাবে বিপদে মাথা ঠা-া রাখতে হয়, কীভাবে যুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হয় তা শিখিয়েছে একটা প্রজন্মকে তিন গোয়েন্দা। অনেক অভিভাবক এই বই পড়তে নিষেধ করতেন, কিন্তু রকিব হাসানের মতে, ‘বই পড়লে লেখাপড়ার ক্ষতি হয় না, বরং বই মগজকে শানিত করে।’
নামে-বেনামে চার শতাধিক বই লিখেছেন তিনি। তিন গোয়েন্দা ছাড়াও টারজান, গোয়েন্দা রাজু, রেজা-সুজা সিরিজসহ অসংখ্য জনপ্রিয় সিরিজের স্রষ্টা তিনি। তবে তিন গোয়েন্দার স্রষ্টা হিসেবেই তিনি অমর হয়ে থাকবেন লাখো পাঠকের হৃদয়ে।
প্রচারবিমুখ বলতে যা বোঝায় ছিলেন তাই। টেলিভিশনে আসতে, সাক্ষাৎকার দিতে চাইতেন না। তার ভাষায়, ‘আমি সাধারণ মানুষ হিসেবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকতে চাই।’ জেমস হ্যাডলি চেজের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন, পাঠক লেখককে চিনবে তার লেখা দেখে। লেখালেখি সম্পর্কে তার পরামর্শ ছিল স্পষ্ট ‘প্রচুর বই পড়তে হবে। লেখাটাকে কোনো অবস্থাতেই সহজ-সরল বিষয় মনে করা চলবে না। ধৈর্য, অধ্যবসায়, বিশ্বস্ততা থাকতে হবে।’ রকিব হাসান কখনোই লস অ্যাঞ্জেলেস যাননি, যেখানে তিন গোয়েন্দার কাহিনিগুলোর পটভূমি তিনি বলতেন তিনি কল্পনার জগতেই থাকতে পছন্দ করেন। বাস্তবতা তার স্বপ্নভঙ্গ করতে পারে। কল্পনার রাজ্যেই একটা প্রজন্মকে বুঁদ করে রেখেছিলেন তার রচনাবলি দিয়ে। তিন গোয়েন্দার ৩০ বছর পূর্তিতে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাজটাই হলো যেটা তুঙ্গে ওঠে, সেটা ছেড়ে দেওয়া।’ তিন গোয়েন্দার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকা অবস্থায়ই তিনি সেবা প্রকাশনী ছেড়ে দিয়েছিলেন, নিউজপ্রিন্ট ছেড়ে হোয়াইট প্রিন্টে যাওয়ার মতো একটা তুচ্ছ কারণে।
রকিব হাসান কেবল একজন লেখক নন, তিনি আমাদের শৈশবের জাদুকর। তার লেখনীতে আমরা হারিয়ে যেতাম রকি বীচের স্যালভেজ ইয়ার্ডে, টেরর ক্যাসেলের ভৌতিক করিডরে, কঙ্কাল দ্বীপের রহস্যময় অরণ্যে। তবে রকিব হাসানের কাছে কিন্তু আমরা শুধুমাত্র তিন গোয়েন্দার জন্য ঋণী নই। উনার রূপান্তরিত বেশ কিছু বইয়ের মাত্র একটি করলেও বাংলা অনুবাদের জগতে, সবচেয়ে বড় কথা দেশের কোটি পাঠকের মনে রকিব হাসান চিরস্মরণীয় হয়েই থাকতেন। যেমন তিমির প্রেম! কানাডার লেখক নিসর্গী ফার্লে মোয়াটের সত্যকাহিনি অবলম্বনে লেখা ‘আ হোয়েল ফর দ্য কিলিং’-এর যে অপূর্ব রূপান্তর তিনি করেছেন তিমির প্রেম নামে, যা বাঙালি পাঠককে নিয়ে গিয়েছিলে গভীর সমুদ্রের জগতে, বিশালাকার তিমিদের জীবন, ভালোবাসা আর মানুষের সঙ্গে তাদের নিষ্ঠুর সম্পর্কের জগতে। রকিব হাসানের রূপান্তর করা ফ্রেড জিপসনের ওল্ড ইয়েলার এবং শিকারি পুরুষ খুবই আকর্ষণীয়।
ফ্রেড জিপসনের দ্য হাউন্ড ডগ ম্যান, এডগার রাইস বারোজের টারজান, হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের মহাভক্ত ছাড়াও কিং সলোমন’স মাইনস-এর সেই অবিস্মরণীয় রূপান্তর সলোমনের গুপ্তধন, রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ট্রেজার আইল্যান্ড, মার্ক টোয়েনের দুঃসাহসী টম সয়্যার, রবার্ট মাইকেল ব্যালান্টাইনের প্রবাল দ্বীপ, ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা উল্লিখিত বইগুলোর যে কোনো একটার রূপান্তরের জন্যই তিনি পাঠকের মনের মুকুরে বিরাজ করতেন চিরদিন।
রকিব হাসান চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন বিশ্বসাহিত্য থেকে রূপান্তর করা অমূল্য এক সাহিত্য ভাণ্ডার। রেখে গেছেন কিশোর-মুসা-রবিন যারা আজও আমাদের সঙ্গে, আমাদের সন্তানদের সঙ্গে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে। এই লেখা যখন শেষ হচ্ছে তার কিছুক্ষণ আগেই কথা হলো বাবার লাশ বহন করে ধানম-ি থেকে বাসাবোতে রওনা হওয়া রকিব হাসানের বড় ছেলে রাহিদ হাসানের সঙ্গে। শোকগ্রস্ত ছেলে জানালেন, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ করেনি, বাবাও এসব চাইতেন না, শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমি এসব নিয়ে কোনো আগ্রহ বাবার ছিল না, বুধবার বাদ এশা বাসাবো কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজার পর বাবাকে দাফন করা হবে শাহজাহানপুর কবরস্থানে।’
এত জনপ্রিয়, একটা প্রজন্মের মানস গঠন করে দেওয়া একজন লেখককেও যখন রাষ্ট্র যথাযথ শ্রদ্ধা জানাতে পারে না, তখন প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে, তার অস্তিত্ব নিয়েই।
রকিব হাসান তো মৃত্যুঞ্জয়ী, তিনি বেঁচে থাকবেন তার লেখায়, ভক্তদের স্মৃতিতে, বাংলা কিশোর সাহিত্যের ইতিহাসে চিরদিনের জন্য, কিন্তু আমরা যারা তাকে যথাযথ শ্রদ্ধা জানাতে পারলাম না, তাদের কী হবে?
লেখক : সাহিত্য সম্পাদক, দেশ রূপান্তর
