ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য নতুন একটি পরিদপ্তর চালু করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কিন্তু ওই সময়ে ন্যূনতম গবেষণার কাজও হয়নি। গত ১৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ¦ালানিভিত্তিক বিদ্যুৎসক্ষমতা হয়েছে মাত্র ১১ মেগাওয়াটপিক। অথচ এ সময়ে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল।
পিডিবির নবায়নযোগ্য জ¦ালানি এবং গবেষণা ও উন্নয়ন পরিদপ্তরটির কাজের পরিধির মধ্যে রয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি (যেমন সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি প্রভৃতি) ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য গবেষণা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তার পাশাপাশি এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া ও পর্যবেক্ষণ করা।
এখন পর্যন্ত এই পরিদপ্তরে ১৩ জন পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা আরাম আয়েশে কাটিয়ে মাস শেষে নিয়েছেন সরকারি পারিতোষিক। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাশ্ম জ¦ালানির ফুরিয়ে আসা ও এর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সারা বিশ্ব নবায়নযোগ্য জ¦ালানির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশেও এটির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবেশবান্ধব এ জ¦ালানির গবেষণায় ও প্রসারে পিডিবির নেতৃত্ব দেওয়ার থাকলেও তা হয়নি। বিগত সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সদিচ্ছার অভাব এবং নীতিনির্ধারকদের অবহেলাকেই দায়ী করছেন তারা।
গত বছরের আগস্টে পটপরিবর্তনের পর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা এই পরিদপ্তরটিতে কাজের গতি অনেকখানি বেড়েছে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানির সম্প্রসারণে নেওয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগ। এক সময়ের ভুতুড়ে পরিবেশ চাঙা হয়েছে কর্মযজ্ঞে।
পরিদপ্তরটিতে নতুন পরিচালক হয়েছেন পিডিবির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের নবায়নযোগ্য জ¦ালানি নীতিমালা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ¦ালনিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্যপূরণে পিডিবির নিজস্ব জায়গায় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে নবায়নযোগ্য জ¦ালানিভিত্তিক অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াটপিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগোচ্ছি। আশা করছি, সময়মতো কাজ শেষ হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ¦ালানি নিয়ে গবেষণারও পরিকল্পনা রয়েছে। এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে পিডিবি।’
পিডিবির তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব উদ্যোগে ২৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিয়েছে। এসব প্রকল্প পিডিবির বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত জায়গায়, নিজস্ব স্থাপনার ছাদে এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী বছরের মাঝামাঝি প্রায় ৮০ মেগাওয়াটপিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ শেষে মিলবে বিদ্যুৎ। পরের বছর আরও প্রায় ৭শ মেগাওয়াটপিকের কাজ শেষ হওয়ার কথা। আরও কিছু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিকল্পনাধীন রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে পিডিবির নিজস্ব স্থাপনার ছাদে ওপেক্স মডেলের (বিনিয়োগকারীর অর্থে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পর সেখান থেকে বিদ্যুৎ কিনবে পিডিবি) মাধ্যমে ১১ মেগাওয়াটপিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কাপ্তাইয়ে ১৭০ কিলোওয়াটপিক ক্ষমতার একটি সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। আগামী মাসে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। আরও ২৬৮ কিলোওয়াটপিক সৌরবিদ্যুতের সিস্টেম স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে ওপেক্স মডেলের আওতায় অন্তত ৭২ মেগাওয়াটপিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হবে শিগগির। আগামী জানুয়ারিতে এসব কাজ শেষ হওয়ার কথা।
পিডিবির রাজস্ব খাত থেকে প্রায় ৪৪ মেগাওয়াটপিক গ্রিড টাইড সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীতে ৫ মেগাওয়াটপিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে। দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে আরও প্রায় ৩৯ মেগাওয়াটপিক সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের। ২ থেকে ১০ মেগাওয়াটপিক সক্ষমতার এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ঠাকুরগাঁও, রংপুর, সৈয়দপুর, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে নির্মাণ করা হবে। এসবের মধ্যে ২ মেগাওয়াটপিক সক্ষমতার একটি ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রও রয়েছে।
কাটাখালি ৫০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় অব্যবহৃত স্থানে ২.২৫ মেগাওয়াটপিক সক্ষমতার আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়াও এগিয়েছে অনেকদূর।
বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প : বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় দুই ধাপে মোট ৫৩৩ মেগাওয়াটপিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে পিডিবি। প্রথম ধাপের (৪৪২ মেগাওয়াটপিক) ডিপিপি প্রণয়ন করে অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগে।
ফেনীর সোনাগাজীতে প্রায় ১১০ মেগাওয়াটপিক সক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাব্যতা পুনঃযাচাই ও কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি দিকগুলোর হালনাগাদের কাজ চলছে। এছাড়া কেরানীগঞ্জে ২৫ মেগাওয়াটপিক, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়াতে ২০ মেগাওয়াটপিক, রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে ৭.৬ মেগাওয়াটপিক এবং চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়াতে ৫০ মেগাওয়াটপিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
পিডিবির পরিকল্পনাধীন ১১টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৬৬৩ মেগাওয়াটপিক। ২ থেকে ১৩৫ মেগাওয়াটপিক ক্ষমতার এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চট্টগ্রামের আনোয়ারা, দোহাজারী ও রাউজান, কক্সবাজারের মহেশখালী, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, ফেনী, রংপুর, বরিশাল এবং কুমিল্লার তিতাসে স্থাপন করা হবে। প্রতিষ্ঠানটির অব্যবহৃত স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানেও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৫ বছরে মাত্র ১১ মেগাওয়াটপিক : পিডিবির নবায়নযোগ্য জ¦ালানি পরিদপ্তর চালুর পর প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব উদ্যোগে মাত্র ৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এ সবের মোট স্থাপিত ক্ষমতা ১০.৪ মেগাওয়াটপিক। বরিশালে ১ মেগাওয়াটপিক ও কাপ্তাইয়ে ৭.৪ মেগাওয়াটপিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র এ সবের মধ্যে রয়েছে। সিরাজগঞ্জে ২ মেগাওয়াটের একটি বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র এ বছর চালু হয়েছে। তবে এর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ওপেক্স মডেলের আওতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাদভিত্তিক ৪০০ কিলোওয়াটপিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
গত ১৫ বছরে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির এমন অগ্রগতিতে হতাশা প্রকাশ করে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ সময়ে অন্তত ৭ থেকে ৮ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত অনায়াসে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ¦ালানির সম্প্রসারণে অনেক গবেষণার ও বহুমুখী কাজের সুযোগ ছিল পিডিবির। তা না হওয়া দুঃখজনক।’
এই ব্যর্থতার পেছনে বিগত সরকারের সদিচ্ছার অভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও দায়িত্বে অবহেলাকে দায়ী করেন এই জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ। তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও আমাদের অগ্রগতি তলানিতে। অনেকে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে জমিস্বল্পতার কথা বলেন। এটা আসলে অজুহাত। নতুন প্রযুক্তি বের হয়েছে, যাতে কৃষিজমি নষ্ট না করেই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা সম্ভব। সে জন্য সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। দেরিতে হলেও পিডিবি যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা ভালো। তবে ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে হবে।’
