ক্যাম্পাসে নবীন শিক্ষার্থীর সমস্যা ও সমাধান

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:০৫ এএম

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ সব শিক্ষার্থীর জন্যই জীবনের নতুন একটি অধ্যায়। ভর্তি পরীক্ষার তীব্র প্রতিযোগিতা পেরিয়ে একাডেমিক জীবনে প্রবেশের পর তারা নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়। এই সমস্যাগুলো তাদের মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া : প্রথম যে সমস্যার মুখোমুখি তাদের হতে হয় তা হলো, নতুন পরিবেশ। ভিন্ন ভিন্ন জেলা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকে। তাদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, জীবনযাত্রা ভিন্ন হওয়ায় মানিয়ে নেওয়া সহজ হয় না। অনেকের কাছে নতুন জায়গায় একাকিত্ব বা মানসিক অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

আবাসন সংকট : বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা হলে থাকার জন্য সিট পেতে সংগ্রাম করে। পছন্দসই রুম বা পরিবেশ না পাওয়ার কারণে অনেকে সমস্যায় পড়ে। বিশেষ করে দূর থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এই আবাসন সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনে অসুবিধা তৈরি হয় এবং পড়াশোনায় মনোযোগ বিঘ্নিত হয়।

আর্থিক সমস্যা : প্রথম বর্ষের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সংকট। অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার খরচ চালাতে টিউশন বা খন্ডকালীন কাজের চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু সবার পক্ষে কাজ পাওয়া সম্ভব হয় না। এতে তারা আর্থিক চাপের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক চাপেও ভোগে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বিশেষভাবে কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে।

খাবারের অনিয়ম ও অপুষ্টি : টানা ক্লাস আর ব্যস্ত সময়সূচির কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সময়ে খাবার খেতে পারে না। ক্যাফেটেরিয়ায় পুষ্টিকর খাবারের বদলে ফাস্টফুডের আধিক্য থাকে। এ ধরনের খাবার অতিরিক্ত তেলে ভাজা হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী হজমজনিত সমস্যা ও শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়।

ঘুমের অভাব : বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই অনেক শিক্ষার্থী রাত জাগার অভ্যাস গড়ে তোলে। তারা ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না, ফলে ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে না। ক্লান্তি, বিষণœতা, নিদ্রাহীনতা এসব উপসর্গ তাদের পড়াশোনা এবং মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে।

পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ভারসাম্যহীনতা: নতুন পরিবেশে আসার কারণে শিক্ষার্থীরা পরিবারের সঙ্গে আগের মতো যোগাযোগ রাখতে পারে না। পড়াশোনা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারায় সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়। তারা মানসিকভাবে অস্থির হয়ে ওঠে।

পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হতে না পারা : অনেক শিক্ষার্থী নিজের পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হতে পারে না। এতে তারা সবসময় হীনমন্যতায় ভোগে। নিজের দক্ষতাকে তুচ্ছ মনে করে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে থাকে। এতে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং সৃজনশীলতা প্রকাশে পিছিয়ে যায়।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগের অভাব : প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে না। এতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত চাহিদা বুঝতে ব্যর্থ হন। ফলে পাঠ্য বিষয় জটিল মনে হয় এবং শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অমনোযোগী হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলের দেখা পাওয়ায় পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে শিক্ষার্থীরা।

উত্তরণের পথ

বিশ^বিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়, তবে সঠিক উদ্যোগ নিলে এগুলো থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। প্রথমেই নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নবীনবরণ, ওরিয়েন্টেশন বা সাং¯ৃ‹তিক কার্যক্রম আয়োজন শিক্ষার্থীদের একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করে। পাশাপাশি সিনিয়রদের মেন্টরশিপ থাকলে নতুনরা দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।

আবাসন সংকটের মতো বড় সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আসনসংখ্যা নিশ্চিত করা দরকার। হলে সিট বণ্টনে স্বচ্ছতা আনা হলে শিক্ষার্থীরা ন্যায্য সুযোগ পাবে। পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী ভাড়া বাড়িতে থাকে, তাদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

অর্থনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, স্টাইপেন্ড বা সহজ শর্তে শিক্ষাঋণ প্রদানের ব্যবস্থা বাড়ানো উচিত। খ-কালীন চাকরি বা টিউশনের সুযোগ সৃষ্টি করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাজেট ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পরিকল্পনা শেখানো প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতা রক্ষার জন্য খাবারের মান নিয়েও ভাবতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত। শিক্ষার্থীদেরও সচেতন হতে হবে এবং অতিরিক্ত ফাস্টফুড এড়িয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ঘুমের অভাব আরেকটি বড় সমস্যা। এর সমাধান করতে হলে সময় ব্যবস্থাপনা শিখতে হবে। রাত জাগা কমিয়ে পর্যাপ্ত ঘুমে অভ্যস্ত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম আয়োজন করলে শিক্ষার্থীরা ঘুমের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে।

পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষায় শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে সময় ব্যবস্থাপনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ চর্চা করলে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনে ভারসাম্য রাখা সহজ হয়। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং সাপোর্ট নেওয়া যেতে পারে।

যেসব শিক্ষার্থী পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হতে পারে না, তাদের জন্য ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং অপরিহার্য। নিজের পড়ার বিষয়কে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা এবং অন্যান্য কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হয়। শিক্ষার্থীদের শেখানো দরকার যে প্রতিটি বিষয়ে উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

সর্বোপরি, একজন শিক্ষার্থী আগ্রহের জায়গাটা বুঝে তার জন্য পড়াশোনাটা সহজ করে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের উদ্যোগ জরুরি। ক্লাসে প্রশ্নোত্তর সেশন বা অফিস আওয়ার চালু করলে শিক্ষার্থীরা সহজে নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পারে। অন্যদিকে শিক্ষকরাও যদি শিক্ষার্থীদের মানসিকতা বুঝে পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণ এবং পরিবর্তন করেন তাহলে শিক্ষার্থীরা সহজেই শিক্ষাক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পারবে।

লেখক : ট্রেইনি এডুকেশনাল সাইকোলজিস্ট ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত