স্থানীয়ভাবে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে উঠা পোল্ট্রি শিল্প এখন মুরগির ফিড, একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) দাবি করছে এ শিল্পের উদ্যোক্তারা সিন্ডিকেট করে বেশি দামে ফিড ও মুরগির বাচ্চা বাজারে বিক্রি করছে। যে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পোল্ট্রি প্রান্তিক খামারিরা। খামারিদের এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে চাল, ডাল, পেঁয়াজের মতো পাশের দেশ (ভারত) থেকে ফিড, মুরগির বাচ্চা এবং মেডিসিন আমদানির দাবি তুলেছেন বিপিএর সভাপতি সুমন হাওলাদার। তিনি হুমকি দিয়েছেন সরকার যদি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ হয় তবে আগামী ১ নভেম্বর থেকে প্রান্তিক খামারিরা ডিম ও মাংসের উৎপাদন বন্ধ করে দেবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কনফারেন্স রুমে বিপিএ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি সুমন হাওলাদার এসব দাবি তুলেন।
জানা গেছে, এর আগে অবশ্য গত ১৭ এপ্রিল প্রান্তিকপর্যায়ে ডিম মুরগির উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দিয়ে মিডিয়াতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছিল বিপিএ। দুদিনের মাথায় আবার এই ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়। অবশ্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সম্প্রতি ডিম দিবসের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সারা দেশে ডিম ও মুরগির উৎপাদনের ৮০ ভাগ আসে দেশের প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপিএ সারা দেশের খামারিদের প্রতিনিধিত্ব করে না, অল্প কিছু খামারি হয়তো এই সংগঠনের সদস্য হয়েছেন। চাইলেই এই সংগঠন ডিম মুরগির উৎপাদন বন্ধ করতে পারে না। কারণ চাইলেই খামার দিনে দিনে বন্ধ করে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে ডিমের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পোল্ট্রি খাতের এক উদ্যোক্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা এক ধরনের স্ট্যান্ডবাজি। ঘোষণা দিয়ে উৎপাদন বন্ধের যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে সেটা এক ধরনের অপরাধ। কারণ সারা দেশের মানুষের ডিম ও মুরগির মাংসের চাহিদার পুরো জোগান আসছে এই সেক্টর থেকে। সেটাকে বারবার বন্ধের হুমকি দিলে প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বাজারে অহেতুক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিপিএ সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ‘দেশে বাজারের সিন্ডিকেট যখন থামানো যাচ্ছে না, তখন যেভাবে চাল ডাল পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, ঠিক একইভাবে পোল্ট্রি ফিড, মুরগির বাচ্চা এবং মেডিসিন ভ্যাকসিন পার্শ্ববতী দেশ থেকে আমদানি করা উচিত। তাহলে আমাদের দেশের সিন্ডিকেট বিলুপ্ত হবে। তাছাড়া কখনোই সিন্ডিকেট বিলুপ্ত হবে না। অতএব আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে একটি ডিমের উৎপাদন খরচ ৫ টাকা, মুরগি ১ কেজি ৯০ টাকা, বাংলাদেশে কেন একটি ডিমের উৎপাদন খরচ ১০ টাকা, মুরগি ১৬৫ টাকা। অযৌক্তিক ফিডের দাম বৃদ্ধি, করপোরেট সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। নেই সরকারের কার্যকর তদারকি। ফলে এ খাতে প্রকৃত অর্থে চলছে অর্থনৈতিক হরিলুট।
তিনি জানান, করপোরেটরা ফিড, বাচ্চা ও ভ্যাকসিন ও মেডিসিন বাজারকে প্রভাবিত করছে এবং প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিচ্ছে। ফলে দেশের প্রকৃত উৎপাদক অর্থাৎ প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। সম্প্রতি বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ৮০ শতাংশ ডিমের উৎপাদন প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে আসলেও দুঃখজনকভাবে সেই অনুষ্ঠানে বা নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তিনি জানান, ২০২৩ সালে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক গবেষণায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের বাজারে প্রতি কেজি ফিডে ১৫ থেকে ২০ টাকা অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে। সরকার তবুও কেন নীরব ভূমিকা পালন করছে ফিডের দাম কমাতে। পার্শ্ববর্তী দেশের বাজারে প্রতি কেজি ফিডের দাম যদি ৩২-৪০ টাকার মধ্যে হয় আমাদের দেশে বেশি কেন।
সুমন হাওলাদার জানান, ২০২১ সালে ৫০ কেজি লেয়ার ফিডের দাম ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা ছিল। ব্রয়লার মুরগির ফিড ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা ছিল। ১টি মুরগির বাচ্চার উৎপাদন খরচ ছিল ২০-২২ টাকা, বিক্রয় ২০-৩০ টাকার মধ্যে। ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে ফিড কোম্পানি বস্তা প্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বৃদ্ধি করে (প্রতি কেজি ২০-২৫ টাকা দাম বৃদ্ধি হয়)। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম অর্ধেক নেমে গেলেও বাংলাদেশে ফিডের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। সয়াবিন মিল (কেক) ৭০-৮০ টাকা থেকে ৪৫-৫০ টাকা, ভুট্টা ৪০-৪৫ টাকা থেকে ২০-৩০ টাকা দাম কমেছে। ২৮-৩০ টাকার উৎপাদন খরচের বাচ্চা বর্তমানে ৫০-৬০ টাকায় বিক্রয় করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে ১০-১৫ টাকায় বিক্রি করে ছোট হ্যাচারিগুলোকে ক্ষতির মুখে ফেলে বাজার থেকে সরানো হচ্ছে। ফলে খামারিরা প্রতিটি ডিমে ২-৪ টাকা এবং প্রতি কেজি ব্রয়লারে ৩০-৪০ টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছে। ১০-১২টি করপোরেট একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
এ সময় সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি। এর মধ্যে ফিড, মুরগির বাচ্চা এবং মেডিসিনের দাম নির্ধারণ করা, করপোরেট প্রভাবমুক্ত বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বিপিএকে নীতি নির্ধারণী মিটিংয়ে ডাকা, ফিড, বাচ্চা ও ওষুধের বাজার নিয়মিত তদারকি করা, উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ১০ শতাংশ লাভ প্রান্তিক খামারিদের জন্য নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সহজ শর্তে ঋণপ্রদান, ভর্তুকি দেওয়া এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ও করপোরেটপন্থি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। এসব দাবি পূরণু না হলে ১ নভেম্বর থেকে পর্যায়ক্রমে খামার বন্ধ করে ডিম-মুরগি উৎপাদন থামিয়ে দেওয়া হবে।
