বোনের অধিকার রক্ষায় জান্নাতের নিশ্চয়তা

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০৭ এএম

ভাইবোন একই মায়ের উদরে পরিপুষ্ট হয়। লালিত-পালিত হয় একই পরিবারে। তাই ভাইবোনের মধ্যকার সম্পর্ক অন্য দশটা সম্পর্কের চেয়ে আলাদা। রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের মধ্যে মা-বাবার পর সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা থাকে ভাইবোনের সম্পর্কে। ভাইবোনের সম্পর্ক মোড়ানো থাকে প্রচণ্ড মায়া ও হৃদ্যতায়। যে হৃদ্যতা ও মায়ার তীব্রতা হয়তো সবসময় প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু তা গভীরভাবে অনুভব করা যায়। ভাইবোনের আচরণে থাকে সহজতা ও কঠোরতার সংমিশ্রণ। ভাইবোন প্রচণ্ড ঝগড়া করলেও তাদের মধ্যে হৃদ্যতা কমে না। এভাবে প্রতিটি পরিবারে ভাইবোন বেড়ে ওঠে। কিন্তু যখন জীবনের দায়িত্ব-অবস্থান বদলে যায়, তখন অনেক সময় এই পবিত্র সম্পর্কে ভাটা পড়ে। বিশেষ করে উত্তরাধিকার সূত্রে বোনের ন্যায্য সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের টানাপড়েন শুরু হয়। অথচ এটা ভাইয়ের ফরজ দায়িত্ব। আর ইসলাম বোনের অধিকার আদায় করাকে শুধু ন্যায়বিচারের দাবি হিসেবে নয়, বরং জান্নাত লাভের উপায় হিসেবেও ঘোষণা করেছে।

আমাদের সমাজে দেখা যায়, এক সময় বোনের বিয়ে হয়। বোন পরিবার ছেড়ে স্বামীর সংসারে চলে যায়। ভাইও বিয়ে করে ফেলে। ভাইবোন আগে একই পরিবারে থাকলেও এখন আলাদা আলাদা পরিবারে থাকে। পরিবার আলাদা হলেও ভাইবোনের সম্পর্ক অটুট থাকে। পরস্পর পরস্পরের খোঁজখবর রাখে। কিন্তু একটা সময়ে গিয়ে আমাদের সমাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে বিপত্তিটা ঘটে তা হলো, বাবার ইন্তেকালের পর ভাইয়েরা পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বোনদের ন্যায্য ওয়ারিশ প্রদান করতে গড়িমসি করে এবং খুব কৌশলে বোনদের বঞ্চিত করে।

এই কারণে কখনো কখনো ভাইবোনের সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়ায়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বোনেরা ওয়ারেশি স্বত্ব পরিত্যাগ করে এই ভেবে যে, এতে ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে এবং বাবার বাড়ির কারও সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। এ ছাড়াও আমাদের সমাজে কিছু কুসংস্কারও প্রচলিত আছে। যেমন বোনেরা পৈতৃক সম্পত্তি নিলে তাদের সংসারে অভাব অনটন দেখা দেবে। এ জন্য অনেকেই এটাকে অপরাধ হিসেবেও দেখে থাকে। যারা এসব কুসংস্কার ছড়িয়ে বোনদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার পাঁয়তারা করে তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।

পবিত্র কুরআনে নির্দেশিত ‘এক ভাই দুই বোনের সমান’ নিয়ম অনুযায়ী একজন বোন ওয়ারিশসূত্রে ভাইয়ের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। বোনের এই ন্যায্য ওয়ারিশ প্রদান করা ভাইয়ের আবশ্যিক দায়িত্ব। এটা ফরজ ইবাদতও বটে। কেননা আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ওয়ারিশ সূত্রে বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি বোনকে যথাযথভাবে প্রদান করতে নির্দেশ করেছেন। সুতরাং এটা নিয়ে গড়িমসি করার কোনো সুযোগ নেই। ভাইয়েরা যদি বোনদের প্রাপ্য সম্পত্তি যথাযথভাবে বুঝিয়ে না দেয়, তাহলে পরকালে ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে এবং জাহান্নাম হবে তাদের স্থায়ী ঠিকানা।

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে শাস্তির বিষয়ে বলেন, ‘কেউ আল্লাহ ও তার রাসুলের অবাধ্য হলে এবং তার নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করলে তিনি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নিসা-১৪)

আর যেসব ভাই পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বোনদের প্রাপ্য অংশ যথাযথভাবে প্রদান করবে সে সব ভাইয়ের জন্য আল্লাহতায়ালা জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। কেউ আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করলে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে। যার পাদদেশে প্রবাহিত হয় নদী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। আর এটাই হলো মহাসাফল্য।’ (সুরা নিসা ১৩)

আমাদের সমাজে বাবা-মায়ের সম্পত্তি থেকে ভাইবোনের সমান অধিকারের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। এ বিষয়ে কথা হলো, কোনো ভাই যদি নিজের সমপরিমাণ সম্পত্তি তার বোনকে দিতে ইচ্ছুক হয় তাহলে এতে ইসলামের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আরেকটি বিষয় হলো, অনেকেই বলেন, ভাইবোনকে সমান সম্পত্তি না দিয়ে ইসলাম এমন বৈষম্য করল কেন? এর উত্তর হলো, ইসলাম কোনো বৈষম্য করেনি। ইসলাম ভাইকে বোনের দ্বিগুণ সম্পত্তি দিয়েছে, আবার ভাইয়ের ওপর পরিবারের যাবতীয় খরচ বহনের দায়িত্বও দিয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলাম বোনকে ভাইয়ের অর্ধেক সম্পত্তি দিয়েছে, কিন্তু পরিবারের খরচ বহনের দায়িত্ব তাকে দেয়নি। সামগ্রিকভাবে কথা হলো, ইসলাম বোনের জন্য যা নির্ধারণ করেছে, তা যথাযথভাবে তাকে প্রদান করা ভাইয়ের আবশ্যিক দায়িত্ব। আর কেউ যদি নিজের সমান অংশ বোনকে দেয় তাহলে সেটা প্রশংসনীয়। 

বোনদের অধিকার আদায়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। মা-বাবার সেবা যতেœ যেমন জান্নাত মেলে, তেমনি বোনদের যতœ নিলে এবং তাদের অধিকার রক্ষা করলেও জান্নাতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার তিনটি মেয়ে বা তিনটি বোন আছে অথবা দুটি মেয়ে বা দুটি বোন আছে, সে তাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করলে এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে মহান আল্লাহকে ভয় করলে তার জন্য নির্ধারিত রয়েছে জান্নাত।’ (জামে তিরমিজি)

বোন মহান আল্লাহর অনেক বড় নেয়ামত। বোনের অন্তরে মহান আল্লাহ ভাইয়ের জন্য সঞ্চিত করে রেখেছেন প্রচণ্ড মায়া। খুব কম ভাই সে মায়াকে স্পর্শ করতে পারে। বোন না থাকা মানে আন্তরিক ভালোবাসা ও তীব্র মায়া থেকে বঞ্চিত হওয়া। মা-বাবার পর দ্বিতীয় আশ্রয়স্থল হলো বোন। বোন বিপদে অন্যতম সহযোগী। পরকালে জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম। একজন ভাই তার বোন থেকে আল্লাহর দেওয়া অনেক নেয়ামত প্রাপ্ত হয়। মহান আল্লাহ যেন ভাইদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্যই বোনদের সৃষ্টি করেছেন। এরপরও অনেক ভাই পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বোনদের বঞ্চিত করে। এসব ভাই দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই হতভাগা। আমরা যেন সেই হতভাগাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তাই আসুন বোনদের প্রাপ্য সম্পত্তিটুকু যথাযথভাবে প্রদান করি। তাদের মুখে হাসি ফোটাই। এই হাসিই আমাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত