চুক্তির বাধায় ঝুঁকিতে বিমানবন্দর

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:২৭ এএম

চুক্তি ছাড়াই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন শাখায় ৪৩ জন পরামর্শক কাজ করছেন; প্রায় বিনা বেতনে। ইতিমধ্যে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ। এ নিয়ে চলছে সমালোচনা। মন্ত্রণালয় চাচ্ছে দ্রুত জনবল বাড়িয়ে বিষয়টির সুরাহা করতে। সংস্থাটি পরামর্শকদের চুক্তির মেয়াদও বাড়াতে চাচ্ছে; এর বিরোধিতা করছে বেবিচকের একটি অংশ। তাদের আশঙ্কা চুক্তির মেয়াদ বাড়ালে ঝুঁকিতে পড়বে দেশের বিমানবন্দরগুলো। অহেতুক টাকা খরচ হবে। উল্লেখ্য, পরামর্শকদের পেছনে খরচ মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা।

অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে বিমানবন্দরের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পরামর্শক ও টেকনিক্যাল কর্মীদের উপস্থিতি অপরিহার্য। চুক্তির মেয়াদ দ্রুত নবায়নের পাশাপাশি কর্মীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা না হলে বিমানবন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং ভাবমূর্তি বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে অস্থিরতা বেড়েই চলবে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, বেবিচকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কর্মরত দেশি-বিদেশি পরামর্শকদের চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। মেয়াদ শেষে চুক্তি দ্রুত নবায়িত না হলে একদিকে যেমন প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা দেখা দেবে তেমনি বেবিচকের অভ্যন্তরীণ কর্মীদের ক্ষোভ ও হতাশা বাড়বে। বিশেষ করে যারা বেতন-ভাতা ছাড়াই দীর্ঘ দেড় বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বেবিচকের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের পরামর্শক এবং তাদের সহযোগী জনবল প্রায় দেড় বছর ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই কাজ করছেন। প্রকল্প ও বিমানবন্দরের দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে তারা নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। বেতনহীন কাজের কারণে কর্মীদের মধ্যে আর্থিক সংকট ও মানসিক চাপ চরম আকার ধারণ করেছে। বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় বেবিচকের দক্ষ জনবলের একটি বড় অংশ কর্ম বিমুখতা ও হতাশার শিকার হচ্ছে।

বেবিচকসূত্র জানায়, পরামর্শক ও টেকনিক্যাল জনবলের চুক্তি দ্রুত নবায়ন না হওয়ার প্রভাব বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিশেষজ্ঞ পরামর্শকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তার নবায়ন হয়নি। আকাশপথের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিভাগ বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন। এখান থেকেই বিমান চালানোর লাইসেন্স, পাইলটদের মেডিকেল বিষয়াদির নবায়ন, কারিগরি ছাড়পত্রসহ সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। অথচ এ বিভাগ চুক্তি হীন ৪৩ পরামর্শকের বিষয়টিই দেখছে না। অনেক আগেই তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই তারা নিয়মিত সই করছেন ফাইলে, মতামতও দিচ্ছেন। তাদের হাতে আকাশপথের নিরাপত্তা থাকা দেশকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্র্তৃপক্ষের একটি অংশ চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে দ্রুত ফাইল চালাচালি করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিভিল অ্যাভিয়েশন পরামর্শক আছে। তবে তাদের নিয়মিত বেতন হচ্ছে। কিন্তু ‘আমাদের এখানে বিনা বেতনে তারা কাজ করছে’। বিষয়টির দ্রুত সমাধান করতে হবে বেবিচককে। একটি অংশ চাচ্ছে তাদের চুক্তির মেয়াদ না বাড়াতে। আবার আরেকটি অংশ বাড়াতে চাইলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ফাইল অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ বরাদ্দ সংক্রান্ত সমস্যার কারণে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, বেবিচকের দক্ষ জনবল স্বল্পতার কারণে পরামর্শকদের দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। সরকারের অনুমোদনেই তাদের নেওয়া হয়েছিল। তারা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না, এটা অমানবিক। পরামর্শকরা বিবিধ প্রক্রিয়ায় নথিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। এখন যদি মন্ত্রণালয় তাদের চুক্তির আওতায় আনার দায়িত্ব না নেয় তাহলে এখন তারা যেসব দায়িত্ব পালন করছেন, তার সব অবৈধ হয়ে যাবে। এ নিয়ে পরে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে।’

সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১২ মে সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর ক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মদ ফরিদ-উজ্জ-জামানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। একই দিনে চুক্তি শেষ হয় সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) আশরাফুল আজহারের। বিশেষ পরিদর্শক ক্যাপ্টেন (অব.) মাজেদ মিয়ার মেয়াদ শেষ হয় গত মাসে। স্পেশাল ইন্সপেক্টর গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এন আই এম ফেরদৌস হোসেনের চুক্তি শেষ হয় গত ৩০ আগস্ট। ১২ জুলাই বিশেষ পরিদর্শক ক্যাপ্টেন (অব.) মনিরুল হক জোয়ারদার, বিশেষ পরিদর্শক ক্যাপ্টেন (অব.) আজিজ আব্বাসি রফিকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর বিশেষ পরিদর্শক ক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মদ ইলিয়াস মালিক, ৪ সেপ্টেম্বর বিশেষ পরিদর্শক ক্যাপ্টেন (অব.) এম শফিউদ্দিন কামাল, বিশেষ পরিদর্শক ক্যাপ্টেন (অব.) এম সফিকুল আজিম, ৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ পরিদর্শক ক্যাপ্টেন (অব.) আবুল কাশেম মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান, ১২ জুলাই বিশেষ পরিদর্শক স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) গুলজার হোসাইন, ৪ মার্চ অ্যাভিয়েশন পাবলিক হেলথ ইন্সপেক্টর অ্যান্ড কনসালট্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রব মিয়া, ২৮ জুলাই লিগ্যাল কনসালট্যান্ট শুভ্র দে, গত বছরের ১০ ডিসেম্বর অ্যাভিয়েশন অ্যাটর্নি ফারজানা নুসরাত, চলতি বছরের ৩০ জুলাই বিশেষ পরিদর্শক গোবিন্দ্র চন্দ্র বাড়ৈ, ৯ সেপ্টেম্বর স্পেশাল ইন্সপেক্টর আসাদুল হক, ১২ জুন বিশেষ পরিদর্শক বেগম হুসনে খানম, ৪ মার্চ কনসালট্যান্ট আবু কায়েস মো. জহিরুল ইসলাম, ৩ জুন জুনিয়র কনসালট্যান্ট তারেক মুহম্মদ মুনিম, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর বিশেষ পরিদর্শক আব্দুল ওয়াদুদ ও ২৬ মার্চ বিশেষ পরিদর্শক আহমদ আরিফ সিরাজী, ৩১ মে জুনিয়র কনসালট্যান্ট উম্মে ফারহা পিয়ার, ১১ জুন জুনিয়র লাইসেন্সিং কনসালট্যান্ট সুমন রায়, ১২ জুন বেবিচকের পিইএল বিভাগের বিশেষ পরিদর্শক একেএম রেজাউল করিম, ২৪ ফেব্রুয়ারি সিনিয়র কনসালট্যান্ট ক্যাপ্টেন (অব.) রাফিউল হক, গত বছরের ৯ নভেম্বর সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. কর্নেল (অব.) আব্দুল খালেক, গত ২৯ মে কনসালট্যান্ট শাহ মোস্তফা আল মামুন, ২ জুন কনসালট্যান্ট তোফাজ্জেল হোসেন, ৩১ জুলাই কনসালট্যান্ট ডা. এআইএম রফিকুল ইসলাম, ৪ জুন কনসালট্যান্ট ডা. আশরাফুল হক, ২ জুন কনসালট্যান্ট লে. কর্নেল (অব.) হাবিবুল ইসলাম, ৩ জুন কনসালট্যান্ট ডা. মঈনুদ্দিন আহমেদ, ৪ মার্চ এএনএস বিভাগের সিনিয়র ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আলী রেজা খান, ৯ মে ইন্সপেক্টর রবীন্দ্র কুমার দাস, ৪ জুন কনসালট্যান্ট শেখ একে রফিক আহমেদ, ৭ জুন কনসালট্যান্ট পরিতোষ কুমার হালদার, ৪ মার্চ মেট ইন্সপেক্টর মঞ্জুরুল হক খান, ৫ জুন কনসালট্যান্ট ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য, ৯ মে কনসালট্যান্ট তপন কান্তি ঘোষ, ৬ জুন জীবেশ চন্দ্র মুখার্জী, ১ সেপ্টেম্বর বিশেষ পরিদর্শক মো. মোতাহার হোসেনের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়।

নাম প্রকাশ না করে চারজন পরামর্শক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো কোনো অন্যায় করিনি। চুক্তি থাকলেও বেতন ছাড়াই কাজ করেছি। এখন চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। বেবিচকের একটি গ্রুপ চাচ্ছে আমাদের চুক্তির মেয়াদ যেন বৃদ্ধি করা না হয়। আরেকটি পক্ষ চাচ্ছে মেয়াদ বাড়াতে। আমরা পড়েছি উভয়সংকটে। সবার মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে।’

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ সাবেক বিমান পরিচালনা পরিষদের সদস্য কাজী ওয়াহেদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন বিভাগে দায়িত্ব পালনকারীদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার। আগুনের ঘটনায় আমাদের ইমেজ নষ্ট হয়েছে। তাদের বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও বেবিচককে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। না হলে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বিমানের নিরাপত্তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত