বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে গবেষণার জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু গত ১০ বছরে একটিও মৌলিক গবেষণা হয়নি প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে। পুরনো প্রযুক্তিকে ঘষামাজা করে গবেষণার নামে চালিয়ে দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাগিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু সেগুলোরও নেই কোনো বাস্তব প্রয়োগ।
প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জনবল বলতে রয়েছেন মাত্র ২ জন গাড়িচালক। চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে বাকিদের ধার করে আনা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং প্রসারের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে চালু হয় বিইপিআরসি। তাদের মূল দায়িত্ব ও কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, বিদ্যমান প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎকর্ষতা সাধন; নবায়নযোগ্য জ্বালানির সাশ্রয়ী ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া; আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ও বিজ্ঞানীদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করা। কিন্তু গত এক দশকেই এসব কাজের মধ্যে তেমন কিছু হয়নি বললেই চলে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গবেষণার জন্য প্রাথমিকভাবে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত তহবিল দেওয়া হচ্ছে। বিইপিআরসির ওয়েবসাইটে গিয়ে যে কেউ তার আইডিয়া জমা দিতে পারবেন যে কোনো সময়। যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হলে গবেষণা কাজের জন্য নির্ধারিত অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতাও করছে বিইপিআরসি।
দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে উদ্ভূত সমস্যাসমূহের উদ্ভাবনী সমাধান ও অনুসন্ধান, নতুন উদ্ভাবনী প্রযুক্তির পরীক্ষণ, পরিবীক্ষণ ও বাস্তবায়নের নিমিত্ত একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যথাযথ পরিচর্যা বা উৎসাহ দানের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুদান ও গবেষণার স্থান নির্ধারণসহ গবেষণা সংক্রান্ত নানা কাজ করার কথা প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু এখনো প্রতিষ্ঠানটি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে অনেক পিছিয়ে। এমনকি সাধারণ মানুষ তো বটেই বেশিরভাগ গবেষকই এই প্রতিষ্ঠানের নাম পর্যন্ত জানেন না।
বিইপিআরসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, ‘কর্মজীবনে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছি। অথচ আমি এখানে নিয়োগ পাওয়ার আগে পর্যন্ত জানতাম না এই ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জনগণ এর সম্পর্কে অবগত নয়। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব জনবল বলতে মাত্র ২ জন গাড়িচালক রয়েছেন, আর সবই চলছে ডেপুটেশনে (বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দায়িত্ব দেওয়া)। ডেপুটেশনে থাকা কর্মকর্তা একটা সময় পরে যখন চলে যাচ্ছেন তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে চলে যাচ্ছেন। সে জন্য নিজস্ব জনবল থাকাটা খুবই জরুরি। সে কাজও শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা গবেষণা তহবিল দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। যে কেউ আমাদের এখানে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জুরি প্যানেল রয়েছে। নিরপেক্ষভাবে তারা গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়ন করেন। আমরা শুধু গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছি না। উদ্ভাবন কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। আমরা চাই প্রায়োগিক গবেষণা চলুক। কোথাও কেউ কিছু উদ্ভাবন করলে আমাদের নজরে আনলে আমরা তাকে সহযোগিতা করব।’
তবুও গবেষণার নামে কিছু প্রকল্প : যাত্রা শুরুর পর গত ১০ বছরে বিইপিআরসি ১৭টি গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন ও সহযোগিতা করেছে। এর মধ্যে ১১টি প্রকল্প শেষ হয়েছে। বাকি ৬টি প্রকল্পের কাজ চলমান।
ইতিমধ্যে গৃহীত গবেষণা কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক থ্রি হুইলারের স্ট্যান্ডার্ড মডেল প্রস্তুত, বর্জ্য থেকে বায়োকোল উৎপাদন, কম গতিসম্পন্ন বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সাশ্রয়ী সিনক্রোফেজর ডিভাইস, প্রায়োরিটি লোড ম্যানেজমেন্ট ভিত্তিক স্মার্ট এনার্জি মিটার, সাবস্টেশন রিমোট মনিটরিংয়ের জন্য ওয়েব ও অ্যাপভিত্তিক সিস্টেম ইত্যাদি।
তবে এগুলোর সবই বিশে^র বিভিন্ন দেশে বহু আগে থেকেই রয়েছে। গবেষণার নামে পুরনো এসব প্রযুক্তিই কিছু ঘষামাজা করা হয়েছে। অথবা আগের প্রযুক্তিই চালিয়ে দেওয়া হয়েছে গবেষণার নামে।
রিকশার নতুন নকশার জন্য ২০২১ সালের অক্টোবরে বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে একটি দল গবেষণা শুরু করে। এ জন্য ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এই অর্থ দিয়ে প্রায় আড়াই বছর পর শেষ হয় কথিত সেই গবেষণার কাজ। এতে দেখা যায়, অনেকটা প্রচলিত ব্যাটারিচালিত রিকশার আদলেই আরেকটি রিকশা তৈরি করেছেন তারা। সেখানে ব্রেক, ইন্ডিকেটর এবং লুকিং গ্লাসের মতো কিছু নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় উন্নত করা হয়েছে। যা অন্যান্য মোটরযানে রয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে প্রকল্পের কাজ শেষে যখন এটি প্রচার হয় তখন কথিত এই গবেষণা নিয়ে বিভিন্ন মহল এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সাধারণ মানুষের অনেকই ‘ট্রল’ বা ব্যঙ্গ করেছেন। একইভাবে অন্যান্য প্রকল্পেরও প্রায় একই অবস্থা।
বর্তমানে এনার্জি হারভেস্টিং গ্লাস (গ্লাস থেকে সূর্যের আলোর সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন), বর্জ্য থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বিগ ডাটার প্রয়োগ এবং সৌরশক্তি ব্যবহার করে পানি থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন ইত্যাদি গবেষণা প্রকল্পের কাজ চলছে। এগুলো সবই এরইমধ্যে বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ শুরু হয়েছে।
কিছুটা গতি বেড়েছে বিইপিআরসির : কার্যক্রম শুরুর ৮ বছর পর ২০১৮ সালে প্রথম গবেষণা প্রকল্প নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে নেওয়া হয় কয়েকটা প্রকল্প। এর মধ্যে টানা ৩ বছর কোনো প্রকল্পই নেওয়া হয়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিইপিআরসির বিভিন্ন পদে কর্মঠ ও আন্তরিক কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার পর কাজের গতি কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু জনবল সংকট ও স্থায়ী জনবল না থাকা বড় সমস্যা হয়েছে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
আগে গবেষণা প্রস্তাব জমা দেওয়ার একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিলেও এখন যে কোনো সময় প্রস্তাব জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষক, তরুণ ও খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিইপিআরসির সদস্য (এন্টারপ্রেনারশিপ) ড. মো. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের চেয়ে কাজের গতি অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন ধরনের গবেষণা প্রকল্পের পাশাপাশি নানান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আমরা একটা কেন্দ্রীয় গবেষণাগার করার উদ্যোগ নিয়েছি। বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণার জন্য চুক্তির পাশাপাশি তাদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তরুণদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতেও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ। প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতের কী কী সমস্যা রয়েছে এবং তা কীভাবে সমাধান করা যায় সেই চেষ্টা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক তরুণ রয়েছেন যারা নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন। আমরা তাদের খুঁজে বের করে সহযোগিতা করছি।’ এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ টেনে বলেন, পত্রিকায় দেখলাম জামালপুরে একটি ছেলে প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেল তৈরি করছে। আমরা তাকে ডেকে কীভাবে তার এই উদ্ভাবন কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে কথা বলেছি। ইতিমধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সঙ্গে তাকে সংযুক্ত করা দেওয়া হয়েছে। তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, দেশে ও বিদেশে কর্মরত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরির মাধ্যমে কার্যকরী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে এবং কাউন্সিলের গবেষণামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের নিয়মিতভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার জন্য কাউন্সিল কর্তৃক নিয়মিতভাবে কারিগরি সেমিনার, কর্মশালা আয়োজন করা হচ্ছে।
বিইপিআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, ‘মানসম্মত প্রস্তাবনার অনেক ঘাটতি রয়েছে। হয়তো এমন হতে পারে অনেকেই আমাদের সম্পর্কে অবগত না। তবে এরপরও কিছু ভালো গবেষণা রয়েছে। এর মধ্যে তরল মানব বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন। এটি একটি মৌলিক গবেষণা। কারণ বিশে^র বিভিন্ন দেশে মানব মল পুড়িয়ে তেল উৎপাদন করলেও তরল মল থেকে তেল উৎপাদন হয়নি।
তবে আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, মানব মল থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন প্রথম শুরু হয় ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে এটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে। এবং বাংলাদেশে যে পদ্ধতিতে তেল তৈরির কথা বলা হচ্ছে সেটিও হচ্ছে বিভিন্ন দেশে।
বিইপিআরসির এমন দৈন্যদশা দিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ মালায়ার জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ও তরুণ বিজ্ঞানী ড. শাহাবুদ্দিন আহমেদ, যিনি সম্প্রতি বিশ্বের আলোচিত হাইড্রোজেন জ্বালানি প্রযুক্তির পরিপক্বতা নির্ণয়ের সূত্র আবিষ্কার করেছেন।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল উদ্ভাবন, ইনকিউবেশন বা উন্মেষ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণায় উদ্যোক্তা তৈরি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে সহায়তা করা, গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ, দেশি এবং বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কোলাবরেশন। কিন্তু গত ১০ বছরে এসব ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি।
তার ভাষায়, গত ১০ বছরে কাগজে-কলমে ১১টি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি করা হলেও কোনোটিরই বাস্তব প্রয়োগ নেই। বিশেষ করে বুয়েট কর্তৃক অটোরিকশার ডিজাইন দেশব্যাপী হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে যেটাকে অনেকেই বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলতে নারাজ। ইতিমধ্যে শেষ করা প্রকল্পগুলোর কোনোটিরই পেটেন্ট অথবা আন্তর্জাতিক কোনো জার্নালে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ হতে দেখিনি। সুতরাং এই প্রকল্পগুলো থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও প্রশ্নবিদ্ধ।
বহির্বিশ্বে গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান যেমন আমেরিকার এনআরইএল, অস্ট্রেলিয়ার এনার্জি রিসার্চ ইনস্টিটিউটস কাউন্সিল, ইউরোপিয়ান এনার্জি রিসার্চ কাউন্সিল অ্যালায়েন্সের আদলে বিইপিআরসিকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এই তরুণ বিজ্ঞানী ও গবেষক।
