অ্যানিমেশনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:০৭ এএম

অ্যানিমেশন! নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙিন চরিত্রদের ছোটাছুটি, হাসাহাসি আর এক কল্পনার জগৎ। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

এক জাদুকরী শিল্প

অ্যানিমেশন! নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙিন চরিত্রদের ছোটাছুটি, হাসাহাসি আর এক কল্পনার জগৎ। কিন্তু এই সহজ-সরল বিনোদন মাধ্যমের গভীরে লুকিয়ে আছে বহু বছরের উদ্ভাবন, পরিশ্রম আর শৈল্পিক দক্ষতার এক দীর্ঘ ইতিহাস। অ্যানিমেশন এমন এক আশ্চর্য শিল্প, যেখানে অনেক স্থির ছবিকে দ্রুত পরপর দেখালে আমাদের মস্তিষ্ক সেগুলোকে নড়াচড়া করা বা জীবন্ত মনে করে। আসলে এটি চোখের এক চমৎকার দৃষ্টিভ্রম, কিন্তু সেই দৃষ্টিভ্রমের ফলেই জন্ম নেয় গল্প, চরিত্র আর অনুভূতির এক বিশাল জগৎ। মানুষ যখন প্রথম গুহার দেয়ালে চলমান প্রাণীর বিভিন্ন ভঙ্গি আঁকার চেষ্টা করেছিল, তখনই অ্যানিমেশনের বীজ বোনা হয়েছিল। এই মাধ্যমটি কেবল বিনোদনের নয়, এটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর শিল্পের দুটোরই এক অসাধারণ এবং সাবলীল মিলন।

গুহাচিত্রে স্পন্দন

অ্যানিমেশনের ধারণাটি যে কত পুরনো, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। এর ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই প্রস্তর যুগে, যখন মানুষ গুহার দেয়ালে শিকার করা প্রাণীদের ছবি আঁকত। ফ্রান্সের লাসকো গুহার দেয়ালের চিত্রগুলোতে দেখা যায়, শিকারি প্রাণীদের একাধিক ভঙ্গিতে এমনভাবে আঁকা হয়েছে, যেন দর্শকের মনে চলনের একটা অস্পষ্ট আভাস তৈরি হয়। যদিও সেটি আজকের অ্যানিমেশন ছিল না, তবু চলনকে ধরে রাখার এটিই ছিল মানবজাতির আদিমতম প্রচেষ্টা। তাদের সেই চিত্রকর্মে ছিল জীবনের স্পন্দনকে ধরে রাখার এক গভীর আকুতি। তবে আধুনিক অ্যানিমেশনের প্রকৃত যাত্রা শুরু হয় উনিশ শতকে, বিজ্ঞান ও শিল্পের হাত ধরে। এ সময়ে কিছু কৌতূহলী উদ্ভাবক এমন কিছু যন্ত্র বা খেলনা তৈরি করেন, যা মানুষের চোখে চলনের বিভ্রম তৈরি করার প্রাথমিক কৌশলটি উন্মোচন করে। এগুলো অ্যানিমেশনের ধারণাকে প্রথম যান্ত্রিক রূপ দিয়েছিল:

থাউমাট্রোপ : এটি ছিল অ্যানিমেশনের প্রথম দিকের এক দারুণ আবিষ্কার। একটি ছোট কার্ডবোর্ডের চাকতি, যার দুই পাশে দুটি ভিন্ন ছবি আঁকা থাকত যেমন একদিকে একটি খাঁচা, অন্যপাশে একটি পাখি। চাকতিটিকে সুতা দিয়ে দ্রুত ঘোরালেই চোখের পলকে দুটি ছবি মিশে গিয়ে মনে হতো পাখিটি যেন খাঁচার ভেতর বসে আছে! এটি মানুষের চোখের দৃষ্টির স্থায়িত্বশীলতা নীতির প্রথম ব্যবহারিক প্রয়োগ ছিল, যা অ্যানিমেশনের মূল ভিত্তি।

ফেনাকিস্টিস্কোপ : থাউমাট্রোপের এক ধাপ পরের এই যন্ত্রটি ছিল আরও উন্নত। এটি ছিল একটি ঘূর্ণায়মান ডিস্ক, যার কিনারায় ধারাবাহিক ছবি আঁকা থাকত এবং ডিস্কে ছোট ছোট ছিদ্র থাকত। আয়নার সামনে ডিস্কটিকে ঘুরিয়ে ছিদ্র দিয়ে তাকালে মনে হতো, ডিস্কের ভেতরের ছবিগুলো যেন নড়াচড়া করছে। একটি ঘোড়া দৌড়াচ্ছে বা একটি লোক হাত নাড়ছে এমন ছোট ছোট দৃশ্য এতে প্রাণ পেত।

জোয়েট্রোপ : এটি ছিল অ্যানিমেশনের প্রাথমিক খেলনাগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয়। এটি একটি ঘোরানো ড্রাম বা সিলিন্ডার, যার ভেতরের দিকে ধারাবাহিক ছবির একটি স্ট্রিপ লাগানো থাকত। ড্রামটি ঘোরানোর সময় এর ওপরের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে তাকালে মনে হতো, ভেতরের ছবিগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে এবং একটি গল্প বলছে।

এসব খেলনা সে যুগে মানুষকে দেখিয়েছিল স্থির ছবিকেও নড়ানো যায়, তাদের দিয়ে গল্প বলানো যায়। এগুলোই ছিল ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন শিল্পের বীজ।

সিনেমার পর্দায় অ্যানিমেশন

বিশ শতকের শুরুতেই অ্যানিমেশন তার প্রাথমিক খেলনার স্তর পেরিয়ে সিনেমার পর্দায় আসতে শুরু করে এবং শৈল্পিকরূপে বিকাশ লাভ করে। ফরাসি শিল্পী এমিল কোহলকে প্রায়ই ‘অ্যানিমেশনের জনক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ফ্যান্টাসমাগোরি : এটি ছিল কোহলের এক যুগান্তকারী সৃষ্টি, যাকে বিশ্বের প্রথম হাতে আঁকা অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কোহল একটি সাদা বোর্ডে আঁকা কাঠির মানব চরিত্র এবং বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার করেছিলেন, যা চলচ্চিত্রটিকে এক ধরনের পরাবাস্তব চেহারা দিয়েছিল। এর প্রতিটি ফ্রেম হাতে আঁকা হয়েছিল এবং নেগেটিভ ফিল্মে শুট করার কারণে এর স্টাইলটি ছিল অনন্য। তখনকার দর্শকদের কাছে এই চলমান আঁকা ছবিগুলো ছিল একেবারেই নতুন এবং এক অদ্ভুত জাদুর মতো। এর কয়েক বছর পর আমেরিকান কার্টুনিস্ট উইনসর ম্যাককে অ্যানিমেশনকে বিনোদন শিল্পে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি শুধু ছবিকে নড়াননি, চরিত্রকে প্রাণ দিয়েছিলেন।

গার্টি দ্য ডাইনোসর : এই কাজটি অ্যানিমেশন জগতে এক বিপ্লব এনেছিল। গার্টি ছিল প্রথম অ্যানিমেটেড চরিত্র, যা একটি ব্যক্তিত্ব, নিজস্ব অনুভূতি, এমনকি অভিমান নিয়ে পর্দায় এসেছিল। ম্যাককে এই কাজটির জন্য প্রায় দশ হাজার ফ্রেম নিজে হাতে এঁকেছিলেন এবং এই ছবির প্রতিটি নড়াচড়া এত নিখুঁত ছিল যে, দর্শক অবাক হয়ে ভাবত কীভাবে এমনটা সম্ভব! গার্টি দেখিয়ে দিয়েছিল, অ্যানিমেশন শুধুই কৌতুক নয়, এক ধরনের অভিনয়ও হতে পারে। এটি চরিত্রকে প্রাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী অ্যানিমেটরদের জন্য এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

ডিজনি যুগ

১৯২০ ও ৩০-এর দশকে অ্যানিমেশনকে পূর্ণাঙ্গ শিল্পে রূপান্তরিত করেন আমেরিকান চলচ্চিত্র প্রযোজক ও উদ্ভাবক ওয়াল্ট ডিজনি। ডিজনির দূরদৃষ্টি ও সৃজনশীলতা অ্যানিমেশনকে বিশ^ব্যাপী একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

স্টিমবোট উইলি : এই চলচ্চিত্রটি অ্যানিমেশনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি ছিল প্রথম অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র, যেখানে শব্দের ব্যবহার ছিল এবং ছবিটি মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। এই চলচ্চিত্রেই বিখ্যাত চরিত্র মিকি মাউসের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে, যা ডিজনি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করে। শব্দের সঙ্গে ছবি নড়াচড়া করার এই কৌশল দর্শককে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, তারা চলচ্চিত্রটিকে বারবার দেখতে আসত। মিকি মাউস দ্রুত বিশ^ব্যাপী আইকনিক চরিত্রে পরিণত হয়।

স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস : এই চলচ্চিত্রটি ছিল অ্যানিমেশন শিল্পের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী কাজ। এটি বিশ্বের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য রঙিন অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। এই ছবির নির্মাণ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু এর অভাবনীয় সাফল্যের পর, অ্যানিমেশনকে শুধু শিশুদের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে, একটি গুরুতর এবং লাভজনক চলচ্চিত্র শিল্প হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। দর্শক অবাক হয়ে দেখেছিল, কীভাবে আঁকা চরিত্রগুলো হাসছে, কাঁদছে, ভালোবাসছে এবং পর্দায় এক জাদুকরী গল্প বলছে। ডিজনি স্টুডিও এই সময়েই মাল্টিপ্লেন ক্যামেরার মতো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ঘটায়, যা অ্যানিমেটেড দৃশ্যে গভীরতা ও বাস্তবতা যোগ করে এবং ভিজ্যুয়াল কোয়ালিটিকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করে। ডিজনির হাত ধরেই অ্যানিমেশন কেবল কার্টুন নয়, বড় পর্দার এক প্রভাবশালী শিল্পে পরিণত হয়।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময় ও নতুন ধারা

দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তী সময়ে অ্যানিমেশন ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিটি অঞ্চল নিজস্ব সংস্কৃতি ও শৈল্পিক স্টাইলে বিকাশ লাভ করে। এ সময় টেলিভিশন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং অ্যানিমেশন ছোট পর্দায়ও নিজের জায়গা করে নেয়।

জাপানি অ্যানিমেশনের সূচনা : যুদ্ধের পর জাপানে এক নতুন শৈল্পিক ধারার জন্ম হয়, যা সারা বিশ্বে ‘অ্যানিমে’ নামে পরিচিত। ওসামু তেজুকাকে প্রায়ই ‘মাঙ্গা ও অ্যানিমের জনক’ বলা হয়। তার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজ জাপানি অ্যানিমেশনকে এক স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিচিত করে তোলে।

অ্যাস্ট্রো বয় : তেজুকা রচিত এই টেলিভিশন সিরিজটি জাপানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং অ্যানিমের শৈলী ও নির্মাণ পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করে। তেজুকার কাজের মধ্য দিয়ে অ্যানিমে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, যেমন বড় চোখ, জটিল ও আবেগপূর্ণ কাহিনি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়বস্তু এগুলো অর্জন করতে শুরু করে। এরপর ‘গানডাম’, ‘সেইলর মুন’, ‘ড্রাগন বল’ বা ‘পোকেমন’-এর মতো সিরিজ বিশ^ জুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পশ্চিমা দেশগুলোতেও টেলিভিশনের মাধ্যমে ‘টম অ্যান্ড জেরি’, ‘দ্য ফ্লিনস্টোনস’ বা ‘লুনি টিউনস’-এর মতো অ্যানিমেশন সিরিজ বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয় হয়। এসব সিরিজ তাদের হাস্যরস, অনন্য চরিত্র এবং উদ্ভাবনী অ্যানিমেশনের জন্য দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। ইউএসএসআর ও পূর্ব ইউরোপেও নিজস্ব স্টাইলে অ্যানিমেশন তৈরি হতে থাকে, যা প্রায়ই গভীর দার্শনিক বা রাজনৈতিক বার্তা বহন করত।

ত্রিমাত্রিক জগতে প্রবেশ : নব্বইয়ের দশকে অ্যানিমেশন শিল্প একটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। হাতে আঁকা ‘সেল অ্যানিমেশন’-এর দীর্ঘ ঐতিহ্য ধীরে ধীরে কম্পিউটারের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে নতুন এক যুগে প্রবেশ করে। হাতে হাজার হাজার ফ্রেম আঁকার পরিবর্তে, কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করে চরিত্র এবং পরিবেশ তৈরি করা শুরু হয়।

টয় স্টোরি : এই চলচ্চিত্রটি অ্যানিমেশনের ইতিহাসে একটি সত্যিকারের মাইলফলক। পিক্সার স্টুডিও দ্বারা নির্মিত এই ছবিটি ছিল বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ কম্পিউটার-অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। ‘টয় স্টোরি’ কেবল একটি সফল চলচ্চিত্রই ছিল না, এটি প্রমাণ করেছিল যে, কম্পিউটার দিয়েও এমন বাস্তবসম্মত, আবেগপ্রবণ এবং জটিল গল্প বলা সম্ভব, যা হাতে আঁকা অ্যানিমেশনের মতো শক্তিশালী। এই সাফল্যের পর, ৩ডি অ্যানিমেশন একটি নতুন শিল্পমানদণ্ড হয়ে ওঠে এবং অ্যানিমেশন তৈরি করার পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়। এর ফলে অ্যানিমেটরদের কাজের ধারাও বদলে যায়, যেখানে তাদের শুধু আঁকার দক্ষতা নয়, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও মডেলিংয়ের জ্ঞানও অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

এ সময়ে ৩ডি অ্যানিমেশন, সিজিআই এবং পরবর্তী সময়ে মোশন ক্যাপচার প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। মোশন ক্যাপচারের মাধ্যমে বাস্তব অভিনেতাদের চলন, অঙ্গভঙ্গি এবং মুখের অভিব্যক্তি রেকর্ড করে তা অ্যানিমেটেড চরিত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়, যা চরিত্রগুলোর চলনকে আরও বাস্তবসম্মত ও জীবন্ত করে তোলে। জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ বা অ্যান্ডি সারকিসের গলাম চরিত্রগুলো মোশন ক্যাপচার প্রযুক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আজ অ্যানিমেশন শুধু সিনেমা বা কার্টুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত