ব্লু ইকোনমি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তির ভারসাম্য

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ০১:৪৮ এএম

একবিংশ শতাব্দীর নতুন অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য শক্তি কিংবা মহাকাশ সব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা এখন শীর্ষে। এই প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতি। যা বিশ্বের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নতুন সীমান্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সমুদ্র আজ শুধু জলরাশির বিশালতা নয়, এটি হচ্ছে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আধার। পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ জুড়ে যে সমুদ্র বিস্তৃত, তার তলদেশে লুকিয়ে আছে অপরিমেয় সম্পদ গ্যাস, তেল, খনিজ, জীববৈচিত্র্য, এমনকি নবায়নযোগ্য শক্তির বিপুল সম্ভাবনা। তাই বলা হয়, একবিংশ শতাব্দী হবে ‘Ocean Century’, যেখানে ‘ব্লু ইকোনমি’ হবে, বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি। বাংলাদেশসহ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য ব্লু ইকোনমি এখন শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তব সুযোগ। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান এই সম্ভাবনাকে আরও গভীর করেছে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল। ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের বর্তমান সামুদ্রিক এলাকা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটারে। এ বিশাল জলভাগে রয়েছে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ৩৩ প্রজাতির ক্রাস্টেশিয়ান এবং তেল-গ্যাসসহ নানা খনিজ সম্পদ। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তাহলে দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অংশ যোগ হবে।

ব্লু ইকোনমি এখন শুধু অর্থনৈতিক ধারণা নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। এ অঞ্চলটি বিশে^র প্রায় ৬০ শতাংশ জিডিপি এবং দুই-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই এই অঞ্চল দিয়ে সম্পন্ন হয়। দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি, আন্দামান সাগর এবং বঙ্গোপসাগর সবই এখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ হিসেবে ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’ চালু করেছে, যার মাধ্যমে তারা এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ জুড়ে এক সামুদ্রিক প্রভাববলয় গড়ে তুলছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ‘ব্লু ইকোনমি সেল’ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং নীল অর্থনীতি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত গবেষণা অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানমূলক ড্রিলিং, স্যাটেলাইট সার্ভেইং, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য গবেষণা বা নবায়নযোগ্য সামুদ্রিক শক্তি উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রে দেশীয় দক্ষতা গড়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এ খাত বাস্তব সাফল্য পাবে না। তা ছাড়া সমুদ্রের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ভয়াবহ। প্লাস্টিক দূষণ, সামুদ্রিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, প্রবাল প্রাচীরের ধ্বংস এবং অতিরিক্ত মাছ ধরা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে বিপন্ন করছে। বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ব্লু ইকোনমির সফলতা নির্ভর করবে, কতটা টেকসইভাবে আমরা এই সম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে পারি তার ওপর।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এখন ‘নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ’ চলছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কৃত্রিম দ্বীপ ও সামরিক ঘাঁটি, যুক্তরাষ্ট্রের সেভেন্থ ফ্লিট, ভারতের আন্দামান নৌবাহিনী, জাপান-অস্ট্রেলিয়ার যৌথ মহড়া সব মিলিয়ে সমুদ্র এখন শক্তির প্রদর্শনীর ক্ষেত্র। এই প্রতিযোগিতা অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরিবেশকে জটিল করে তুলছে। তবে আশার বিষয় হলো, ব্লু ইকোনমি শুধু শক্তি প্রতিযোগিতার গল্প নয়, এটি সহযোগিতারও ক্ষেত্র। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ তিনটি স্তরে দেখা যায় অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত। অর্থনৈতিক স্বার্থ হলো, টেকসই সম্পদ আহরণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি। নিরাপত্তা স্বার্থ হলো, সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পরিবেশগত স্বার্থ হলো  উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই তিন স্তরের ভারসাম্য রক্ষা করেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি উপকূলীয় জনজীবনে যে প্রভাব ফেলছে,  সেটি ব্লু ইকোনমির পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের  ‘মেরিন স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ ধারণা বাস্তবায়িত হলে, এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নীল অর্থনৈতিক করিডোর হতে পারে। সরকার ইতিমধ্যে কক্সবাজার, মহেশখালী, পায়রা এবং টেকনাফ উপকূলে ব্লু ইকোনমিসংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রেও বিপ্লব দরকার। বাংলাদেশের উচিত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া। সামুদ্রিক প্রতিযোগিতার মাঝে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নই হবে শ্রেষ্ঠ কৌশল।

ভবিষ্যৎ বিশ্বে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করবে সমুদ্রের ওপর। ‘ওশান এনার্জি’ হবে পরবর্তী বিপ্লব। সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার-ভাটা, বাতাস, এমনকি শৈবাল থেকেও শক্তি উৎপাদনের প্রযুক্তি এখন বাস্তব। সামুদ্রিক কৃষি, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, ক্রুজ পর্যটন, উপকূলীয় অর্থনীতি সব মিলিয়ে এক বিশাল কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন মানুষের জীবিকা সরাসরি সমুদ্রনির্ভর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই খাত প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের জীবনধারণের সঙ্গে যুক্ত। আগামী দশকে ব্লু ইকোনমি বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার মানচিত্র বদলে দিতে পারে। যে দেশ তার সামুদ্রিক সম্পদ সুরক্ষা ও ব্যবহারে দক্ষ হবে, সেই দেশই নেতৃত্ব দেবে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক বিশ্বে। বাংলাদেশের উচিত, এখনই নীল অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়া। ব্লু ইকোনমি হচ্ছে ভবিষ্যতের ‘নীল সোনা’। এই সোনাকে উত্তোলনের জন্য দরকার জ্ঞান, দক্ষতা ও কৌশলগত দূরদৃষ্টি। ইন্দো-প্যাসিফিক বাস্তবতায় এটি শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ নয়, বরং টিকে থাকার সংগ্রাম। এখন সময় এসেছে সমুদ্রের দিকে তাকানোর লোভের চোখে নয়, দূরদর্শিতার দৃষ্টিতে।

লেখক :  কলামিস্ট ও শিক্ষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত