আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। নির্বাচনসংক্রান্ত সব প্রস্তুতি ১৫ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করতে বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচন ঘিরে বড় শক্তির কাছ থেকে আক্রমণ আসতে পারে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ মোকাবিলার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
গতকাল বুধবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এমন নির্দেশনা নিয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বৈঠক বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা বৈঠকে মূলত চারটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেগুলো হলো মাঠপ্রশাসন কর্মকর্তাদের পদায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য মোকাবিলার উপায়।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান প্রেস সচিব। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে পোস্টাল ভোটের জন্য অ্যাপ রাখবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের আগের এবং পরের ৭২ ঘণ্টা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় খুবই পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার আসবে। নির্বাচন বানচালে ভেতর থেকে, বাইরে থেকে অনেক শক্তি কাজ করবে। ছোটখাটো নয়, বড় শক্তির কাছ থেকে আক্রমণ চলে আসতে পারে। এই নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হবে। এআই দিয়ে ছবি-ভিডিও তৈরি করে ছেড়ে দেওয়া হবে। এটা সামাল দিতেই হবে। একটা অপপ্রচারের রচনা হওয়া মাত্রই সেটা ঠেকাতে হবে যেন ছড়াতে না পারে। যত ঝড় আসুক না কেন, আমাদের সেটা অতিক্রম করতে হবে।’
নির্বাচনকালীন পদায়ন নভেম্বরেই, ডিসেম্বরের প্রথমে ভোটের তারিখ ঘোষণা : ব্রিফিংয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘আমরা বারবার একটাই কথা বলছি, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন হবে। আর ভোটের তারিখ ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। তারা বলেছে, সম্ভবত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এটা জানাবে।’
শফিকুল জানান, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নের বিষয়ে এলাকার গুরুত্ব বিবেচনায় কর্মকর্তাদের দক্ষতা বিবেচনা করে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় বদলি ও পদায়নের বিষয়ে ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। এর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবে এমন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানও শুরু করেছে।
পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, শারীরিক যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, গণমাধ্যমে অনিয়মের প্রতিবেদন হয়েছে কি না, তা দেখা হবে বলে জানান শফিকুল আলম। তিনি বলেন, সবচেয়ে ফিট কর্মকর্তাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পদায়ন করা হবে। তবে নিজ জেলা বা শ্বশুরবাড়ির এলাকায় কাউকে পদায়ন করা হবে না। আগামী ১ নভেম্বর এগুলো শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও সভায় জানিয়েছেন যে পুলিশের পদায়নের বিষয়েও একইভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৬৪ জেলার এসপিদের তালিকা করা হয়েছে।
নির্বাচনে কারা কারা দায়িত্ব পালন করছে এ বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, সেনাবাহিনী জানিয়েছে সাড়ে ৯২ হাজারের মতো সেনা এবং নৌবাহিনীর সদস্য কাজ করবেন। এর মধ্যে ৯০ হাজার থাকবেন সেনাসদস্য আর বাকিটা নৌবাহিনীর সদস্য। ভোটের দায়িত্বে সব থেকে বেশি থাকছে আনসার সদস্য। পুলিশের কাছে বডি ক্যামেরাও থাকবে।
বৈঠকে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা রুখে দিতে সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, গত তিন নির্বাচনের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, এবার তাদের নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে রাখা হবে না।
প্রেস সচিব আরও জানান, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ (ট্রেনিং) নিয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে আনসার সদস্যদের প্রশিক্ষণ আরও কার্যকর করার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। বডিওর্ন ক্যামেরা নিয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে। প্রশিক্ষণসংক্রান্ত ভিডিও ও উপকরণগুলো যেন ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট, টিভি বা বিটিভিতে আসে, সে বিষয়ে দ্রুত কাজ করার জন্য বলা হয়েছে। সংসদ অধিবেশন না থাকায় এখন সংসদ টেলিভিশন ব্যবহৃত হচ্ছে না, তাই নির্বাচন কমিশন সংসদ টিভিকে ব্যবহার করে নির্বাচনসম্পর্কিত যাবতীয় প্রচার করতে চাইছে।
শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিলে কেউ যেন আগের কর্মকান্ড ভুলে না যান : ব্রিফিংয়ে বিদেশি গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশের বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী এই প্রশ্ন করেন একজন সাংবাদিক। জবাবে শফিকুল আলম বলেন, শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার গ্রহণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বলতে পারবেন। আর সাক্ষাৎকারটি তারা এখনো পড়েননি। পড়ার পর এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন।
এ প্রসঙ্গে শফিকুল আলম আরও বলেন, যারা তার ইন্টারভিউ করছেন, তারা যেন তার অতীতের কর্মকা- ভুলে না যান। শেখ হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি জাতিসংঘের রিপোর্টে স্পষ্ট। এ ছাড়া আরও দুটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে, তিনি খুন করার নির্দেশ দিচ্ছেন। একবিংশ শতকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়ে বড় খুনি নেই, সেটা জাতিসংঘের প্রতিবেদনেই রয়েছে বলে জানান প্রেস সচিব। তিনি বলেন, ‘কেউ কোনো অপকর্ম করে পার পাবে, এটা হবে না। সেই অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকছে।’
প্রসঙ্গত, গতকাল বুধবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপি শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে সুযোগ না দিলে ভোট বর্জনের কথা বলেছেন, এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, তারা মনে করছেন না।
এই প্রশ্নের উত্তরে শফিকুল আলম আরও বলেন, ‘আমরা এটা দেখিনি। বাট আওয়ামী লীগ তো নেই। আমরা তো কোথাও আওয়ামী লীগকে দেখিনি। দুয়েকটা ঝটিকা মিছিল... সেই অনুযায়ী কেউ কেউ হয়তোবা দুয়েকটা ডলার পান, এই তো।’
প্রেস সচিব আরও বলেন, ‘যে ক্লেইমগুলো (দাবিগুলো) উনি (শেখ হাসিনা) করেন, সেটা যেন আনকনটেস্টেড (একপক্ষীয়) না থাকে। একটি লোকাল নিউজ মিডিয়াতেও দেখা গেছে যে, আইসিসিতে তার পার্টি একটি ক্লেইম করছে, সেখানে তিনি যে ভয়ানক রকমের হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন করেছেন, তার কোনো ধরনের মেনশন (উল্লেখ) নেই। এটি দুর্ভাগ্যজনক। আরও দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ক্লেইম করছে চারশ জন মারা গেছে। সেটাও আনকনটেস্টেড দেওয়া হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে শফিকুল আলম আরও বলেন, ‘দেশের টাকা চুরি করে নিয়ে ইউকের (যুক্তরাজ্যের) সবচেয়ে দামি ল ফার্মকে হায়ার করে এ ধরনের কাজ তারা করছে। এটাকে আবার দেশের কেউ কেউ প্রমোট করছে।’
