জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫ স্বাক্ষরিত হয়েছে, যেখানে সব রাজনৈতিক দলই স্বাক্ষর করেছে। তবে ঐকমত্য কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা যখন স্বাক্ষরিত নথিটি চূড়ান্তভাবে জমা দিলেন, তখন দেখা গেল—বিএনপির স্বাক্ষর করা পাতা সেখানে নেই, বরং অন্য পাতা যুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।
বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের খোলাবাড়িয়া গ্রামে জন্মান্ধ আব্দুল গফুর মল্লিকের বাড়িতে গিয়ে আর্থিক সহায়তা প্রদানকালে এসব কথা বলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশ বর্তমানে এক ভিন্নরকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় আমরা দেখেছি ফ্যাসিবাদী শাসন, গুম–খুনের রাজনীতি, বিরোধী দলের কণ্ঠরোধের সময়কাল—যেখানে মানুষ ভয় ও আতঙ্কে ফিসফিস করে কথা বলত।
একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভয়ে কেউ উচ্চস্বরে কিছু বলতে পারত না। সেই সময়টি ছিল শেখ হাসিনার আমলে, আওয়ামী লীগ ও চৌদ্দদলীয় জোটের শাসনামলে।
তিনি বলেন, গত ১৬ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আমরা আপসহীনভাবে সংগ্রাম করেছি—মানুষের বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সভা–সমাবেশ ও মিছিলের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য, যা সংবিধানে নিশ্চিত আছে।
বিএনপির চেয়ারপারসনকে বন্দী করে তার উন্নত চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার পর দলের হাল ধরেন তারেক রহমান। তিনি গোটা জাতিকে ভার্চুয়ালি ঐক্যবদ্ধ করে ছাত্র ও জনতার আন্দোলনকে বেগবান করেছেন।
রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার সময়ের তুলনায় হয়তো এখন কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করছি; কিন্তু সামগ্রিকভাবে প্রশ্ন রয়ে যায়—আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে কি না, কোনো কারিগরি প্রভাব বা নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং হবে কি না।
তিনি বলেন, আজ যখন জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫ স্বাক্ষরিত হলো, তখন দেখা গেল বিএনপির স্বাক্ষর করা পাতা নেই—অন্য পাতা যুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
ড. ইউনূস সাহেব একজন সম্মানিত ও গুণী ব্যক্তি। তার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের প্রতি বিএনপিসহ আন্দোলনরত সব রাজনৈতিক দল সমর্থন জানিয়েছিল। তার গঠন করা কমিশনের মাধ্যমে এমন প্রতারণামূলক কাজ হবে—এটি কেউ বিশ্বাস করতে পারে না।
রিজভী আরও বলেন, বর্তমানে সংবিধানে এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু আছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ করতে হলে সংবিধান সংশোধন বা বাতিল করতে হবে। প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী সংবিধান বাতিলের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক দেশের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জুলাই সনদে বলা হয়েছে—২৭০ দিনের মধ্যে পার্লামেন্ট যদি পাশ না করে, তাহলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে (অটো পাশ) গৃহীত হবে। একদলীয় বা কর্তৃত্ববাদী দেশ ছাড়া পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এমন নিয়ম নেই।
তিনি বলেন, সত্যিকার গণতন্ত্রের জন্য আবু সাঈদ, ওয়াসীম, মুগ্ধরা জীবন দিয়েছেন। সেই ঐকমত্য কমিশন কীভাবে জনগণের সঙ্গে এমন প্রতারণা করতে পারে—তা বেদনাদায়ক। আমরা নিরাশ নই; আশা রাখি, স্বাধীনতার পর যেভাবে সংবিধান সংশোধন হয়েছে, ভবিষ্যতেও তা জনগণের স্বার্থে সংশোধিত হবে।
রিজভী আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন চালু করে—বাকশাল গঠন করে, সব রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে। পরে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সংবিধান সংশোধন করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং সংবিধানে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” সংযোজন করেন।
তার মতে, পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য সংবিধান সময়ের সঙ্গে সংশোধিত হয়। কিন্তু এজন্য সংবিধান বাতিলের প্রয়োজন নেই। সংবিধানের ঘাটতি পূরণে সনদ প্রণয়ন করে সংসদের মাধ্যমে তা সংযোজন করা যেতে পারে। অন্যথায় একটি সুগঠিত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।
শেষে রুহুল কবির রিজভী বলেন, আব্দুল গফুর মল্লিক চোখে দেখতে পান না, কিন্তু পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই বিষয়টি তারেক রহমানের নজরে আসে, এবং তার উদ্যোগেই আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। পরে রুহুল কবির রিজভী তার হাতে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা তুলে দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন, সদস্য সচিব মোকছেদুল মোমিন, রাজবাড়ী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আইনজীবী লিয়াকত আলী, যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. আসলাম মিয়া, সদস্য সচিব কামরুল আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম. এ. খালেদ পাভেলসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
