ব্রেক ওয়াটার নিয়ে বিডারদের ডাক

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৬ এএম

ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের ধরন জানতে বিডারদের ডেকেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। ১৪২ বছর আগে ব্রিটিশ রয়েল নৌবাহিনীর সার্ভেতে বঙ্গোপসাগরের ভেতরে যে চরের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল, সেই চরকে ব্যবহার করে কীভাবে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করবে, তা জানতে আজ সোমবার দেশি-বিদেশি বিডারদের (যেসব ঠিকাদার কাজ করতে আগ্রহী) ডেকেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর তাদের কাছ থেকে অর্জিত জ্ঞান নিয়েই তৈরি করা হবে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের দরপত্রের বিভিন্ন দিক।

এদিকে দেশি-বিদেশি ঠিকাদারদের ডাকতে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট ও বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেই বিজ্ঞপ্তিতে আজ সোমবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অডিটোরিয়ামে আগ্রহী বিডারদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ আমাদের জন্য নতুন। এটি নির্মাণের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে আমরা আগ্রহী বিডারদের ডেকেছি। তারা কীভাবে  ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করবে কিংবা এর প্রক্রিয়া কী হতে পারে, তা জানতে মূলত ডাকা হয়েছে।’

কতজন বিডার আপনাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ওমর ফারুক বলেন, ‘অনেকে সরাসরি উপস্থিত থাকবেন, আবার দেশের বাইরে থেকে অনেকে জুমেও আমাদের সঙ্গে যুক্ত থেকে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন।’

বে-টার্মিনালের ‘বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ (বিটিএমআইডিপি) নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই প্রকল্পের আওতায় বে-টার্মিনালের চ্যানেল তৈরি, চ্যানেল ঘিরে  ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ এবং টার্মিনালের সঙ্গে রেল, সড়ক সংযোগ স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলোকে এই প্রকল্পের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। এর প্রাথমিক বাজেট প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এই বাজেটের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ১০ হাজার কোটি এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থছাড়ের বিষয়টিও সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায়  ব্রেক ওয়াটার নির্মাণে ৮ হাজার ২৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, নেভিগেশন অ্যাকসেস চ্যানেল নির্মাণে ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, নেভিগেশনে সহায়ক যন্ত্র স্থাপনে ৫৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং রেল, সড়ক সংযোগসহ অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এখন এই  ব্রেক ওয়াটার ও এক্সেস চ্যানেল নির্মাণে বিডারদের আহ্বান করেছে এই প্রকল্পের উপপরিচালক প্রকৌশলী রাফিউল আলম। বিডাররা কি তাদের কাজের ধরন উপস্থাপন করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকৌশলী রাফিউল আলম বলেন, ‘আমরা ওয়েবসাইটে তিন পৃষ্ঠার ছক দিয়েছি। সেই ছক পূরণ করে তারা তাদের উপাত্তগুলো আমাদের কাছে আগামীকাল (আজ সোমবার) জমা দেবেন। একই সঙ্গে বে-টার্মিনালে  ব্রেক ওয়াটার কীভাবে নির্মাণ করবে, তা আমাদের সামনে উপস্থাপন করবে।’

তাদের ডেকে আপনারা কী জানতে পারবেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী এর মাধ্যমে আমরা বাজার যাচাই করতে পারব। একই সঙ্গে বে-টার্মিনালে  ব্রেক ওয়াটার নির্মাণে আগ্রহী বিডারদের আমরা একটি তালিকা পেয়ে যাব। এতে দরপত্র তৈরি করতে এবং পরে  ব্রেক ওয়াটার নির্মাণে তা সহায়ক হবে।’

জানা যায়, ২০১৬ সালে জার্মান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেলহর্ন সার্ভে করতে গিয়ে হালিশহর রাসমনি ঘাট ও ইপিজেডের মধ্যবর্তী এলাকায় সাগরের মধ্যে একটি চরের সন্ধান পান। এই চরকে অস্থায়ী চর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল তখনকার সার্ভেতে। তাদের রিপোর্টে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় বালি জমা হয়ে চরটি গড়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করা হয়। যদি এই চরকে স্ট্যাবল (স্থায়ী) করা যায়, তাহলে এটাকে ভিত্তি করে বে-টার্মিনাল নির্মাণ করা যেতে পারে বলে রিপোর্টে বলা হয়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে থাকা ১৮৮৩ সালের ‘চিটাগাং রিভার’ নামের একটি ম্যাপ রয়েছে। সেই ম্যাপেও এই চরটি রয়েছে। মূলত চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের কোথায় কত গভীরতা রয়েছে এবং কোথায় চর বা দ্বীপ রয়েছে, তা উল্লেখ রয়েছে ম্যাপটিতে। ১৮৮৩ সালে সার্ভে হলেও লন্ডন থেকে ম্যাপটি প্রিন্ট হয়েছিল ১৮৮৫ সালে ১ জুলাই (চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল)। সেই ম্যাপের চরটিকে আজ  ব্রেক ওয়াটা র হিসেবে ব্যবহার করে বে-টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে।

ব্রেক ওয়াটা র কী?

ইপিজেডের পেছন দিকে সাগরের প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি আকারে দুটি চর রয়েছে। এই চর দুটি (ব্রিটিশ ম্যাপে যে চরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে) ভাটার সময় প্রায় ডুবে যায়। কিন্তু চর ও উপকূলের মধ্যবর্তী অংশে পানির গভীরতা সাত থেকে আট মিটার। সাগরের ভেতরের এই দুই চরকে শাসন করে ১৪ মিটার চওড়া ও ছয় থেকে ছয় মিটার উচ্চতার দেয়াল নির্মাণ করা হতে পারে। আর এই দেয়ালকে বলা হয়  ব্রেক ওয়াটা র। উপকূলের অংশে নির্মাণ হবে জেটি। জেটি ও  ব্রেক ওয়াটা রের মধ্যবর্তী জায়গায় এসে জাহাজগুলো প্রবেশ করবে।

জানা যায়, দুটি চরের মধ্যবর্তী জায়গায় প্রায় এক কিলোমিটারের মতো অংশ ফাঁকা রয়েছে, মধ্যবর্তী এই ফাঁকা অংশের চওড়া কমিয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ মিটারে আনা হতে পারে। এই ৭০০ থেকে ৮০০ মিটার চ্যানেল দিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জাহাজগুলো বে-টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশ করবে ও পণ্য ওঠানামার পর বের হয়ে যাবে। আর এই আসা ও যাওয়ার রাস্তাই হলো এক্সেস চ্যানেল।

ব্রেক ওয়াটা র কেন প্রয়োজন?

সাগর থেকে আসা বড় বড় ঢেউয়ের আঘাতে যাতে জেটি নষ্ট না হয়, সেজন্য দূর থেকেই ঢেউটিকে বাধা দেওয়ার জন্য  ব্রেক ওয়াটা র নির্মাণ করতে হয়। বিশ্বের অনেক বন্দরে কৃত্রিমভাবে  ব্রেক ওয়াটা র নির্মাণ করতে হয়। আমাদের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরেও প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ কৃত্রিম  ব্রেক ওয়াটা র নির্মাণ করতে হয়েছে। যাতে সাগরের ঢেউ ও উপকূলের পলি এসে চ্যানেলে (জাহাজ চলাচলের রাস্তা) জমতে না পারে।

বে-টার্মিনালে হবে তিনটি টার্মিনাল

স্থলভাগে বে-টার্মিনালের জন্য তিনটি টার্মিনালের মধ্যে দুটি কনটেইনার টার্মিনালের একটি পিএসএ সিঙ্গাপুর ও অন্যটি দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড নির্মাণ করবে বলে জি টু জি চুক্তি হয়েছে। অন্য মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করার কথা থাকলেও এখানেও জি টু জি ভিত্তিতে বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান সম্প্রতি সংবাদকর্মীদের জানান, পিএসএ সিঙ্গাপুর ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ও দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড ২ বিলিয়ন ডলার এবং মাল্টিপারপাস টার্মিনালে আরও ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হতে পারে।

হালিশহর ইপিজেডের পেছন থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় বে-টার্মিনাল নির্মিত হবে। সাগরের ভেতরের প্রায় ২৩০০ একর জায়গায় নির্মিত হতে যাওয়া বে-টার্মিনালে জোয়ার-ভাটা, দিন-রাত, বাঁকা চ্যানেল কিংবা ড্রাফটের (গভীরতা) কোনো সেই সীমাবদ্ধতা নেই। বে-টার্মিনাল নির্মাণ হলে যেকোনো দৈর্ঘ্য ও প্রায় ১৩ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে। বিপরীতে বর্তমান বন্দর চ্যানেলে মাত্র ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ কর্ণফুলীতে প্রবেশ করতে পারে। সেই ক্ষেত্রেও জাহাজকে দুটি বাঁক অতিক্রম করতে হয় এবং দিনের মাত্র চার ঘণ্টা সময় পাওয়া যায়। কিন্তু বে-টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ পরিচালনা করা যাবে। ল্যান্ড লর্ড পদ্ধতিতে চালু হতে যাওয়া বে-টার্মিনাল চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাব ঘোচাবে বলে বন্দর-সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত