জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোট আয়োজন ইস্যুতে আলোচনায় বসার জন্য জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। দলটি বলছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র সরকারের-এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই।
বর্তমানে সনদ ও গণভোট ইস্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আয়োজন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে রাজপথে নেমেছে জামায়াত ও তাদের সমমনা ৭টি দল। অন্যদিকে, গণভোটের এ দাবিকে সংসদ নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করছে বিএনপি।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দলগুলোকে এক সপ্তাহের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আহ্বান জানানো হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ তাহের বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে টেলিফোন করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দেন।
এ প্রস্তাব নিয়ে ওই রাতেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দলের স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক বসে। বৈঠকে উপস্থিত অধিকাংশ নেতা জামায়াতের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, জামায়াতের ডাকে আলোচনায় বসার কোনো যৌক্তিকতা নেই। অবশ্য এ বিষয়ে সরকার যদি রাজনৈতিক সংলাপের উদ্যোগ নেয়, তাহলে বিএনপি তাতে অংশ নিতে পারে বলে বৈঠকে কয়েকজন নেতা মত দেন।
বিএনপির নেতারা বৈঠকে বলেন, গত ৯ মাস ধরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে অংশ নিয়ে জুলাই সনদের কিছু প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে তাদের দল। এছাড়া সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের প্রস্তাবও তারা দিয়েছে। কিন্তু সেই প্রস্তাব উপেক্ষা করেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সনদ চূড়ান্ত করে সরকারের কাছে জমা দেয়। তখন থেকেই সংকটের সৃষ্টি হয়, যার দায় সরকার ও কমিশনের ওপরই বর্তায়।
বিএনপির অবস্থান খুবই স্পষ্ট-সমস্যার সমাধান দিতে হবে সরকারকেই, সমঝোতা নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজন করতে হবে।
বিএনপির বৈঠক শেষে দলীয় অবস্থান তুলে ধরে বলা হয়, জুলাই সনদ আইনানুগভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যথাসময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পক্ষই নতুন করে সংকট সৃষ্টি করে নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। আমাদের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তই এ ব্যাপারে দলের চূড়ান্ত অবস্থান। সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট করতে হবে।
সরকারের ভূমিকা নিয়ে সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র ধ্বংস ও নির্বাচন বানচালের জন্য এক ধরনের চক্রান্ত চলছে। সরকার যদি সঠিক পথে না হাঁটে, তবে এর পুরো দায় তাদেরই নিতে হবে।
অন্যদিকে, বিএনপি আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও গণভোট নিয়ে সমঝোতা তৈরির জন্য অন্যান্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে জামায়াতে ইসলামীর দুই সদস্যের একটি কমিটি। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টিসহ মোট ৯টি দলের সঙ্গে তাদের আলোচনা এগোচ্ছে। বিএনপি প্রকাশ্যে আগ্রহ না দেখালেও নেপথ্যে দলটির কয়েকজন নেতা জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে।
জামায়াতের নেতারা মনে করছেন, যেকোনো সময় আলোচনার দরজা আবারও খুলে যেতে পারে।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি দল নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে তিন দফা কর্মসূচির আওতায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তারা ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।
জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করা হবে। আমাদের দাবি না মানলে আমরা মহাসমাবেশ করব, আন্দোলন আরও তীব্র হবে এবং ঢাকার চিত্র বদলে যাবে।
তবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দেশের স্বার্থে এবং গণতন্ত্রকামী সব দলকেই একে অপরের সঙ্গে সংলাপে বসা উচিত। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো একই ভাষায় কথা বলছে। তারা বলছে, জামায়াতের ডাকে কেন আলোচনায় বসবে?
তিনি আরও বলেন, বিএনপি ডাকলে আমরাও আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি টেবিলে বসা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ নেই। জামায়াতের আহ্বানে বিএনপি আলোচনায় বসবে না-এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আমাদের জানানো হয়নি।
