আধিপত্যের বিরোধে মুন্সীগঞ্জ সদরের মোল্লাকান্দিতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ বিএনপি কর্মী রায়হান খান (২২) মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তিনি। এ নিয়ে গত সোমবারের সংঘর্ষের বলি হলেন বিএনপির দুই কর্মী। তা ছাড়া দলটির দুই গ্রুপের বিরোধের জেরে সংঘর্ষ ও গুলিতে আট দিনের ব্যবধানে ঝরেছে তিন বিএনপি কর্মীর প্রাণ।
গত সোমবার সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে বিএনপি কর্মী আরিফ মীর (৩৫) খুনের ঘটনায় দুদিনেও নিহতের পরিবারের পক্ষে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার রাতে চরডুমুরিয়া গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে আরিফের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। ওইদিন রাতভর অভিযান চালিয়ে পুলিশ সাকিল ঢালী ও জিহাদ হোসেন নামের দুজনকে আটক করেছে।
সদর থানার ওসি এম সাইফুল আলম জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিএনপি কর্মী রায়হানের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে। তিনি আরও জানান, সোমবার সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে বিএনপি কর্মী আরিফ মীর নিহতের ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি।
অন্যদিকে, একের পর এক ঘটনায় রীতিমতো আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে মোল্লাকান্দি। সদর উপজেলার চরাঞ্চলের এ ইউনিয়নটির গ্রামে গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ ইউনিয়নের চর মাকহাটি ও নামা মাকহাটি পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া চরডুমুরিয়া গ্রামে দিনের বেলায় পুরুষরা বাড়িতে অবস্থান করলেও রাতের বেলায় বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। একই সঙ্গে ইউনিয়নের বেহেরকান্দি, আমঘাটা ও মহেশপুর গ্রামে এখন নিস্তব্ধ নীরবতা চলছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চরাঞ্চলের সন্ত্রাসী জনপদ মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা বিএনপির সদস্য আতিক মল্লিক ও ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি অহিদ মোল্লা। অন্য গ্রুপের নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উজির আলী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লা। আর ওই দুই বিরোধের জেরে গত ২ নভেম্বর রাতে ইউনিয়নের বেহেরকান্দি গ্রামে নিজ বাড়ির পাশে প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন বিএনপি কর্মী তুহিন দেওয়ান (২২)। তিনি আতিক-অহিদ গ্রুপের অনুসারী ছিলেন। এই খুনের পর থেকে আতিক-অহিদ গ্রুপের অনুসারী দলের কর্মীরা চরডুমুরিয়া গ্রাম থেকে বিতাড়িত ছিলেন। এ অবস্থায় গত রবিবার রাতে আতিক-অহিদ গ্রুপের বিতাড়িত লোকজন চরডুমুরিয়া গ্রামে ঢুকতে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটালে প্রতিপক্ষ উজির-আওলাদ গ্রুপের লোকজন পাল্টা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। উভয় গ্রুপের পাল্টাপাল্টি ককটেল বিস্ফোরণে রাতভর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই আতঙ্কের মধ্যেই সোমবার সকালে জড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষে। দুই গ্রুপের লোকজন নিজেদের চেনার জন্য পৃথক দুই ধরনের টি-শার্ট পরে নামে সংঘর্ষের মাঠে। এ সময় একটি গ্রুপের কর্মীরা সবুজ ও অন্য আরেক গ্রুপের কর্মী কালো রঙের টি-শার্ট পরিধান করেন। রক্তক্ষয়ী এ সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে খুন হন বিএনপি কর্মী আরিফ মীর। এ সময় ঘটনায় দুজন গুলিবিদ্ধসহ তিনজন আহত হন। গুলিবিদ্ধ রায়হান খান (২২) ও ইমরান মীর (২৪) এবং আহত মো. ফারুককে (২২) ঢামেকে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রায়হান।
এ ব্যাপারে জানতে বিএনপি নেতা আতিক মল্লিক, অহিদ মোল্লা, উজির আলী ও আওলাদ হোসেন মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লার বড় ভাই দেলোয়ার হোসেন মোল্লার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি নিহত আরিফ মীর ও রায়হান খানকে উজির-আওলাদ গ্রুপের অনুসারী বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘চর মাকহাটি ও নামা মাকহাটি গ্রাম থেকে আতিক মল্লিকের লোকজন আমাদের লোকদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওই গ্রাম দুটিতে আমাদের লোকজনের পাঁচটি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। সংঘর্ষে নিহত আরিফ মীর ও রায়হান খান আমাদের গ্রুপের অনুসারী।’
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিন বলেন, মোল্লাকান্দির এ ঘটনা বিএনপির দলীয় কোনো ব্যাপার নয়। এটি তাদের স্থানীয় আধিপত্যের ঝামেলা। এর দায় বিএনপির নয়। তা ছাড়া আমি ইতিমধ্যেই পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলেছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছি। তাতে বিএনপির পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ থাকবে না।’
এ প্রসঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে কথা হলে পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক মোল্লাকান্দির ঘটনায় পুলিশ সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সংঘাতের সঙ্গে জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সেখানে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করেছে ইতিমধ্যে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য করণীয় সবকিছু করা হবে।
