নন্দিত এবং নিন্দিত, বাংলাদেশের ক্রিকেটে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের ভূমিকা নিয়ে দুই রকমের বক্তব্যই পাওয়া যায় ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। ২০২৩ বিশ্বকাপে নাসুম আহমেদকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অপবাদ নিয়ে বরখাস্ত হতে হয় এই শ্রীলঙ্কান কোচকে। আবার তার কাছেই এই বছরের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাটিং অনুশীলনের জন্য দ্বারস্থ হয়েছিলেন সাদমান ইসলাম এবং মমিনুল হক। আগস্টে সিডনিতে হাথুরুসিংহের একাডেমিতে নিজ খরচে অনুশীলন করে এসেছেন দুজনে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে সাদমান এবং মমিনুল দুজনেই পেয়েছেন রানের দেখা। সাদমান আউট হয়েছেন ৮০ রান করে, মমিনুল দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে ৮০ রানে অপরাজিত। দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে সাদমান জানালেন, প্রধান পরিবর্তনটা এসেছে মনোজগতে। এখন রানের বলগুলোতে রান করার চেষ্টা করেন সাদমান, যেটাই তার ব্যাটিংয়ে বড় একটা পরিবর্তন এনে দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বছর সাতেক হয়ে গেছে সাদমানের। ২০২২ এর পর ২০২৪, মাঝে বছর দুয়েক জাতীয় দলে সুযোগ মেলেনি এই বামহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের। পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট দিয়ে প্রত্যাবর্তনের পর ১২ টেস্টে সাদমানের রান ৭২৮, গড় প্রায় ৩৫ আর স্ট্রাইক-রেট ৫৪। এই বছরের ৫ টেস্টে সাদমানের ব্যাটিং গড় ৪৫, স্ট্রাইক রেট প্রায় ৬০। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়ে এই পরিবর্তনটা স্পষ্ট দেখা গেছে তার ব্যাটিংয়ে। আগে অনেক বেশি বল ছাড়তেন সাদমান, উইকেটে সময় কাটালেও বল মাঝ ব্যাটে খেলতেন অপেক্ষাকৃত কম। এখন নিজেই বললেন, ‘তেমন কোনো চিন্তা নিয়ে আসলে ব্যাটিং করা হয় না, চেষ্টা থাকে এখন রানের বলগুলোতে রান করার, এটাই সবসময় চিন্তা করি, এটাই বোধহয় সাহায্য করে।’ সাহায্য যে করছে তার প্রমাণ সিলেটের এই মাঠে সেপ্টেম্বরে জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টির ম্যাচে সাদমানের ৬১ বলে ১০১ রানের ইনিংস, যেখানে ১১টা চার আর ৪টা ছক্কা। একই মাঠে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সাদমান খেললেন ১০৪ বলে ৮০ রানের ইনিংস, ৯বাউন্ডারি আর ১ ছক্কায়। ম্যাথিউ হামফ্রের বলে কাট করতে গিয়ে ব্যাটের নিচের দিকের প্রান্তে বল লাগে, আম্পায়ার শুরুতে আউট না দিলেও আয়ারল্যান্ড রিভিউ নেওয়ার পর টিভি আম্পায়ার স্নিকোমিটারে দেখেছেন স্পাইক। তাই ৮০ রানেই থেমে যায় প্রতিশ্রুতিশীল ইনিংস, যেটা হতে পারত তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় শতক।
সিডনিতে কী করলেন হাথুরুসিংহের সঙ্গে? এমন প্রশ্নে সাদমান জানালেন, ‘বলতে গেলে ওখানে যাওয়াটা, ওদের কন্ডিশনটা ইউজ করার জন্য। এ জন্যই যাওয়া। সিডনি যে রকম পিচ, এর জন্যই যাওয়া। ওখানে ও (হাথুরুসিংহে) ছাড়া ওখানে যাওয়ার ফ্যাসিলিটিজটা ছিল না বা উপায়টা ছিল না। ওখানে গিয়ে যে টেকনিক্যালি অনেক কাজ করেছি এ রকম কিছু না, জাস্ট ওর সঙ্গে কথা বলেছি... মানে কীভাবে ব্যাটিং করা যায়, কীভাবে রান বড় করা যায়, কীভাবে খেলায় একটু বদল আনা যায়, এগুলোই। আর কিছু মানে ওরকম মানে কাজ করা হয়নি। আবহাওয়াও খুব ভালো ছিল না, বৃষ্টি ছিল, আমরা বেশিরভাগ অনুশীলন ইনডোরেই করেছি।’
কখনো ছোটখাটো একটা ভুল শুধরে দেওয়া, মনোজগৎটায় একটু আত্মবিশ্বাসের জ্বালানি জোগান দেওয়া; এ সবই বড় প্রভাব ফেলে খেলোয়াড়ের জীবনে। ভারত সফরে আসার আগে ম্যাথু হেডেন একবার আগেই চলে এসেছিলেন বিষেণ সিং বেদির কাছে, স্পিন বোলিংয়ের বিপক্ষে ব্যাটিং অনুশীলন করতে। হাথুরুসিংহে লম্বা সময় ধরে বাংলাদেশ দলের কোচ থাকলেও সিরিজের সময়টুকু ছাড়া বাংলাদেশেই থাকতেন না। সে কারণে কারও উন্নতির জন্য ব্যক্তিগতভাবে সময় ব্যয় করার সুযোগটাও ছিল না। এবারে ঘণ্টায় ২৫০ ডলার করে একাডেমি ব্যবহারের ফি আর হাথুরুসিংহের নির্ধারিত সম্মানী দিয়েই তার পরামর্শ শুনে এসেছেন সাদমান ও মমিনুল। প্রাথমিকভাবে দুজনের খেলাতেই দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক ছাপ। তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ তো আয়ারল্যান্ড, উন্নতি কতটা হলো সেটা বোঝা যাবে বড় প্রতিপক্ষের শক্তিশালী বোলিংয়ের বিপক্ষেই।
ব্যাটিংটা ভালো হওয়ার স্বস্তি যেমন আছে সাদমানের, তেমনি আছে সেঞ্চুরি করতে না পারার আক্ষেপও। ৭৬, ৪৬, ৮০; সবশেষ ৪ ইনিংসে সাদমান এভাবেই সম্ভাবনা জাগিয়েও ছুঁতে পারেননি মাইলফলক। সেই আক্ষেপটা মেনেও নিলেন সাদমান, ‘সেঞ্চুরি না হলে তো একটা আফসোস থাকে। তো আলহামদুলিল্লাহ, মানে যতটুকু আল্লাহ দিচ্ছেন, তো ওটা নিয়েই। আমি চেষ্টা করব যে নেক্সট যদি হয়, পরে ওরকম জায়গা সেট হতে পারি, তো চেষ্টা করব বড় করার।’
সেঞ্চুরির দেখা না পেলেও একটা রেকর্ডে ঠিকই নাম তুলে ফেলেছেন সাদমান আর মাহমুদুল হাসান জয়। উদ্বোধনী জুটিতে দুজন মিলে যোগ করেন ১৬৮ রান। টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে ওপেনিংয়ে এর চেয়ে বড় জুটির রেকর্ড আছে শুধু তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েসের। ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩১২ রান যোগ করেন দুই বাঁহাতি ওপেনার। সেটি এখনো ওপেনিংয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটি। এছাড়া দুজনের ২২৪ ও ১৮৫ রানেরও উদ্বোধনী জুটির রেকর্ড রয়েছে। এখন তামিম-ইমরুলের পরই আছেন জয়-সাদমান। তবে পরিসংখ্যানের চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে স্বস্তি। অনেকদিন পর বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছে না ব্যাট করাটা বিশ্বের কঠিনতম কাজ। নিন্দুকরা বলবেন প্রতিপক্ষ তো আয়ারল্যান্ড! তবে সপক্ষে যুক্তিও আছে, হংকং কিংবা নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচেও তো ভালো ব্যাটিং করেনি বাংলাদেশ।
