আশুলিয়ায় ৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড

ট্রাইব্যুনালে ক্ষমা চাইলেন রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হক

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ০১:২৪ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় চব্বিশের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় নিহত শহীদদের জন্য কিছু করতে না পারার জন্য তাদের পরিবার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হক।

আজ বুধবার (১৯ নভেম্বর) তার জবানবন্দি শেষে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এদিন আশুলিয়ায় ছয় মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া এবং ৭ জনকে হত্যা করার অভিযোগে সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ১৬ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন আবজালুল। ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেল, যা অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বে গঠিত, তার জবানবন্দি রেকর্ড করে।

২৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে দায়ের করা জবানবন্দিতে রাজসাক্ষী আবজালুল গত বছরের ৫ আগস্টের পুরো ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। যদিও মরদেহ পোড়ানোর সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না, তবে ১৫ আগস্ট নিজে জব্দকৃত অস্ত্র জমা দিতে আসার সময় জানতে পারেন যে লাশগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি জানান, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি সায়েদ ও এএসআই বিশ্বজিৎ মিলিতভাবে ৬টি মরদেহ পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেন। সাক্ষ্যগ্রহণের শেষে ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি।

চলতি বছরের ২১ আগস্ট মামলায় ১৬ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। ওই সময় উপস্থিত ৮ আসামির মধ্যে ৭ জন নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তবে এসআই শেখ আবজালুল হক দোষ স্বীকার করেন এবং একইসঙ্গে রাজসাক্ষী হয়ে মামলার তথ্য আদালতের কাছে জানাতে চান। তার দোষ স্বীকারের অংশও রেকর্ড করা হয় এবং লিখিত আবেদন অনুযায়ী তিনি রাজসাক্ষী হতে অনুমতি পান।

এর আগে, মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারিত থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতির কারণে তা হয়নি, যদিও আসামিরা হাজির ছিলেন। ১২ নভেম্বরও একই কারণে সাক্ষীকে হাজির করা হয়নি প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে। আজ সেই সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

গত ৫ নভেম্বর ২২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শী শাহরিয়ার হোসেন সজিবের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। তার উপস্থিতির সময় একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান, এবং তার বন্ধু সাজ্জাদ হোসেন সজলকেও পুলিশ আগুনে পুড়িয়ে দেয়। পরে তাকে জেরা করেন স্টেট ডিফেন্স ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

৩০ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন গুলিবিদ্ধ ভুক্তভোগী সানি মৃধা। ২১ নম্বর সাক্ষী হিসেবে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি পুলিশের গুলিতে নিজে আহত হওয়ার তথ্য জানান এবং ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় ঘটিত নির্মমতার দৃশ্যও বর্ণনা করেন। ২৯ অক্টোবর জব্দ তালিকার সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন আশুলিয়া থানার এসআই মো. আশরাফুল হাসান। তিনি জানান, চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল থানার ওসির নির্দেশে রাইফেলের ৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে থানায় জমা দেন।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথমদিনের সাক্ষ্য দেন শহীদ আস সাবুরের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম এবং শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের বাবা মো. খলিলুর রহমান। এর আগের দিন সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, যিনি ৫ আগস্টের বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেন।

প্রসিকিউশন ২ জুলাই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগের সঙ্গে ৩১৩ পৃষ্ঠা তথ্যসূত্র, ৬২ জন সাক্ষীর তালিকা, ১৬৮ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণ এবং দুটি পেনড্রাইভ সংযুক্ত করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়।

মামলায় গ্রেপ্তার ৮ আসামি হলেন– ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, আবজাল ও কনস্টেবল মুকুল। সাবেক এমপি সাইফুলসহ আটজন এখনও পলাতক।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে ৬ তরুণ নিহত হন। পরে তাদের লাশ পুলিশ ভ্যানে তুলে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় একজন জীবিত থাকলেও তাকে বাঁচানো হয়নি। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত