২০২৬ সালের জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ ৩১ অবশেষে তুরস্ক আয়োজন করতে যাচ্ছে। কপ-৩০-এ দীর্ঘ আলোচনা ও অচলাবস্থা কাটিয়ে তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে হওয়া এক অপ্রত্যাশিত সমঝোতার পর পথ খুলে যায় আয়োজনের। এদিকে ব্রাজিলের উদ্যোগে গঠিত ট্রপিক্যাল ফরেস্টস ফরএভার ফ্যাসিলিটিতে (টিএফএফএফ) ১ বিলিয়ন ইউরো সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে জার্মানি, বিশ্বব্যাপী বনসংরক্ষণে যা বড় সহায়তা হয়ে উঠবে বলে মনে করছে ব্রাজিল।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, এবার আয়োজনের পালা ছিল পশ্চিম ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর। তবে আয়োজক হতে তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া কেউই ছাড় দিচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া নিজেদের দাবি সরিয়ে তুরস্ককে সমর্থন করায় বিরোধের অবসান হয়। সমঝোতা অনুযায়ী, কপ ৩১ এর সভাপতি হবেন অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু মন্ত্রী ক্রিস বাউন, আর তুরস্ক দেখবে ভেন্যু ও লজিস্টিকের সব আয়োজন। কপ অনুষ্ঠিত হবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় একটি দ্বীপে।
এই সিদ্ধান্তে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পাপুয়া নিউ গিনির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাস্টিন টকাচেঙ্কো বলেন, ফলাফল তারে সন্তুষ্ট করেনি। সলোমন দ্বীপপুঞ্জও আগে থেকেই জানিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়া আয়োজক না হলে তারা হতাশ হবে। অস্ট্রেলিয়া গত কয়েক বছর ধরেই অ্যাডিলেডে সম্মেলন করার জন্য তদবির করছিল, অন্যদিকে তুরস্কাবি তুলেছিল ২০২১ সালে নিজেদের পালা থেকে সরে দাঁড়িয়ে তারা গ্লাসগো কপ আয়োজনে যুক্তরাজ্যকে সুযোগ দিয়েছিল, তাই এবার তাদের দাবিটি ন্যায্য।
ক্রিস বাউন বলেন, আপস না হলে সম্মেলন জার্মানির বন শহরে সরিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকত না, যা এক বছরের নেতৃত্ব সংকট তৈরি করত। কপ সভাপতি হিসেবে আলোচনার সব ক্ষমতাই তিনি ব্যবহার করবেন বলে জানিয়েছেন। তুরস্কও ভেন্যু পরিচালনার জন্য নিজেরে একজন সভাপতি নিয়োগ দেব।
এদিকে কপ ৩০ এ জলবায়ু অর্থায়নে বড় অগ্রগতি এসেছে ব্রাজিলের নেতৃত্বে গঠিত টিএফএফএফ এর মাধ্যমে। ইতিমধ্যে নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স, কলম্বিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিশ্রুতিতে তহবিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.৬৫ বিলিয়ন ডলার। জার্মানির নতুন ১ বিলিয়ন ইউরো যোগ হলে এটি আরও শক্তিশালী হবে। ব্রাজিলের ধারণা, আগামী বছরের নভেম্বরের মধ্যে তহবিলের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। যদিও যুক্তরাজ্য এখনই অর্থ ঘোষণা করেনি, তবে ভবিষ্যতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি।
এই তহবিলের লক্ষ্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংরক্ষিত প্রতিটি হেক্টর ক্রান্তীয় অরণ্যের জন্য চার ডলার করে সরাসরি সহায়তা দেওয়া। বিশ্বব্যাপী বনসংরক্ষণে এটি নতুন গতি আনবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংস্থার নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল বলেন, কপ ৩০ ইতিমধ্যেই বাস্তব জলবায়ু পদক্ষেপে ‘চিত্তাকর্ষক সাফল্যের তালিকা” তৈরি করেছে। তার মতে, এ পদক্ষেপ ভবিষ্যতে শক্তিশালী অর্থনীতি, নতুন কর্মসংস্থান এবং কোটি মানুষের উন্নত জীবনের পথ তৈরি করবে। প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন দ্রুত করতে কপ প্রক্রিয়াকে বাস্তব অর্থনীতি, নীতি ও বিনিয়োগের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমঝোতা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কপ ৩০এ উপস্থিত ১৯০ এর বেশি দেশের স্বীকৃতি প্রয়োজন। তবে দীর্ঘ অচলাবস্থার পর সমাধানে পৌঁছানোয় কোনো দেশই আপত্তি তুলবে না এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।
আগামী জলবায়ু সম্মেলন হবে তুরস্কে : আগামী বছর জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে তুরস্ক। অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এই সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির নেতৃত্ব দেবে অস্ট্রেলিয়া।
গতকাল বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য কপ৩০ সম্মেলনে সমঝোতার মধ্য দিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন। এই সমঝোতার ফলে ২০২২ সাল থেকে কপ৩১ আয়োজন নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের মধ্যে চলা বিরোধের অবসান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, বর্তমানে দুই দেশ এমন একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার প্রধান দিকগুলো হলো, তুরস্ক কপ৩১-এর সভাপতিত্ব করবে। সম্মেলন-পূর্ববর্তী অনুষ্ঠান প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষির দায়িত্ব পালন করবে অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এবিসি) রেডিওকে আলবানিজ বলেন, এই সমঝোতা অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্ক দুই দেশের জন্যই একটি বড় জয়।
উভয় দেশকে এখন মাত্র এক বছরের মধ্যে এই বিশাল সম্মেলনের প্রস্তুতি নিতে হবে, যেখানে কয়েক হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করবেন এবং জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনা হবে।
