ইংরেজ শাসনামলে বিশেষত আঠারো শতকের শেষ ও উনিশ শতকের প্রথম দিকে এদেশে সামাজিক অসঙ্গতি ও পীড়ন, ধর্মীয় অনাচার, শিক্ষার অভাবে কুসংস্কার, বিকৃতি, নীলকরদের অত্যাচার, দাস-গোলামদের ওপর নিপীড়ন, হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ধনিক শ্রেণির অনিয়ন্ত্রিত জীবনাচার প্রভৃতি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এ সময় ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের মন বিষিয়ে উঠলেও বড় কোনো বিদ্রোহ সংগঠিত হয়নি। কিন্তু প্রাণ ওষ্ঠাগত মানুষের দুঃখ নিরসনে কিছু মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন। তারা হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর তাদের সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলন এ সময়েই করেছিলেন। সে সময়েই এক স্বল্পায়ু মানুষ শিক্ষিত শ্রেণি বিশেষত ছাত্রদের মনে প্রশ্ন করার কৌতূহল তৈরি করে দিয়েছিলেন।
তিনি ডিরোজিও, হিন্দু কলেজের একজন শিক্ষক, যার শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে সমাজ পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। তাদের হাত ধরেই বাংলায় রেঁনেসা এসেছিল। একে তো আয়ু পেয়েছিলেন একদম কম, তার ওপর তাকে ঘিরে এত বেশি পরিমাণে নেতিবাচক কথা প্রচলিত ছিল যে, তাকে নিয়ে আলোচনা এক সময় একদম বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। সে জন্যই হয়তো ডিরোজিও নিয়ে খুব বেশি বই বা প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি সাহিত্য রচনাও করেছেন। কিন্তু সেগুলো বাংলা ভাষায় লিখিত নয়, ইংরেজিতে রচিত। পরে সেগুলো বাংলায় অনূদিত হলে বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে। কিন্তু সব বয়সী পাঠকের উপযুক্ত তার জীবনী ও রচনা অধরাই হয়ে গিয়েছিল।
বাংলার জাগরণের এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের কীর্তি ও রচনা সংক্ষেপে পরিবেশন করেছেন লেখক মামুন রশীদ। তার ‘ডিরোজিও’ বইয়ে তিনি ডিরোজিও সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণার পাহাড় ভেদ করে তুলে ধরেছেন সত্যটুকু। এ জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন, ডিরোজিওর নিজের জবানবন্দি, যা তিনি দিয়েছিলেন হিন্দু কলেজের কর্র্তৃপক্ষের নোটিসের জবাবে। সে কারণে মামুন রশীদের ‘ডিরোজিও’ বইটি হয়ে উঠেছে এই মনীষা সম্পর্কে বাংলা ভাষায় যে গুটিকয়েক প্রামাণ্য জীবনী রয়েছে তার একটি। বইটিতে খুব সুন্দরভাবে ডিরোজিওর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে অন্ধ গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা মূর্ত হয়ে উঠেছেন।
ডিরোজিও বাঙালি ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইউরেশীয় পরিবারের সন্তান। বাবা ছিলেন পর্তুগিজ আর মা ছিলেন এ দেশীয় ইংরেজ। এ দেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা বলে ডিরোজিও নিজেকে কখনো ইউরোপীয় বা শে^তাঙ্গ ভাবতেন না। নিজেকে একজন ভারতীয় হিসেবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। তার পুরো নাম হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। তার বাবার নাম ফ্রান্সিস ডিরোজিও আর মায়ের নাম সোফিয়া জনসন। ছোটবেলাতেই মা হারান ডিরোজিও। ছয় বছর বয়সে ভর্তি হন ধর্মতলা একাডেমিতে। স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন স্কটিশ শিক্ষাবিদ ডেভুড ড্রামন্ড। তিনি মুক্তচিন্তক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। ধর্মতলা একাডেমিও তার শিক্ষা ও ব্যতিক্রমী শিক্ষা পদ্ধতির কারণে সুপরিচিত ছিল। তার উৎসাহেই ডিরোজিও পড়েছিলেন দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য ও ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস। এই বিদ্যালয়ের পরীক্ষা পদ্ধতিও ছিল ব্যতিক্রমী। বছর শেষে মূল্যায়ন পরীক্ষা হতো জনসাধারণের সামনে। পরীক্ষক আসতেন বিদ্যালয়ের বাইরে থেকে। তিনি ছাত্রদের প্রশ্ন করতেন আর ছাত্ররা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলে জনসমক্ষে সবাই মিলে তাকে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানানো হতো। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মঞ্চভীতি থেকে যেমন মুক্তি পেত তেমনি ধর্মতলা একাডেমির শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠত। এর ফলে তারা যেকোনো বুদ্ধি পরামর্শে এবং লেখাপড়া লাগে এমন কাজে সাহয্য পাওয়ার জন্য এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে আসত। ডিরোজিও ছিলেন ধর্মতলা একাডেমির তারকা শিক্ষার্থী। প্রতি বছর একাধিক বিষয়ে প্রথম স্থান করে মানুষের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। পত্রিকাতে ফলাও করে তার কৃতিত্বের কথা প্রকাশিত হতো। এভাবেই তার বক্তৃতার দক্ষতা, আবৃত্তির খ্যাতি ও বিশ্লেষণে ক্ষমতা সম্পর্কে সবাই জ্ঞাত হয়।
মাত্র আট বছর পড়াশোনার পর তাকে ধর্মতলা একাডেমি থেকে বিদায় নিয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে হয়। বাবার কোম্পানি মেসার্স জেমস স্কট অ্যান্ড কোম্পানিতেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পরে কলকাতায় ফিরে আসতে হয়। কলকাতায় তিনি ইন্ডিয়া গেজেটের সহসম্পাদক পদে যোগ দেন। এ ছাড়া তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষক হিসেবেও যোগ দেন। আর এই হিন্দু কলেজেই তিনি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ও ফলবান সময় পার করেছেন। তিনি শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অনন্য। তার বয়স তখন মাত্র সতেরো। ছাত্ররা তার প্রায় সমবয়সীই ছিল। তিনি ছাত্রদের শেখাতেন, ‘ধর্ম হোক, সমাজবিধান হোক, ঐতিহ্যের রীতি হোক, সবকিছুকেই যুক্তির কষ্টিপাথরে বিচার করে তবে জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। যুক্তির কোনো বিকল্প নেই। যুক্তি প্রয়োগ করে, প্রশ্ন করে, কঠিন বিচার করে তারপর সত্যকে গ্রহণ করা, এর কোনো বিকল্প নেই। অন্ধ সংস্কার, শাস্ত্র কথার চাপিয়ে দেওয়া অনুশাসন, পশুর মতো আনুগত্য এসব মেনে চলবে মানুষ? তাহলে সে মানুষ কীসে?’ তিনি বলতেন, ‘পরীক্ষায় পাস করা নয়, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সে শিক্ষাকে জীবনে প্রয়োগ করা।’
তিনি চাইতেন তার ছাত্ররা চিন্তা করতে শিখুক। তাই ছাত্রদের উৎসাহ দিতেন বিতর্কে। তিনি বলতেন, ‘যে তর্ক করে না, সে অন্ধ গোঁড়ামিতে ভুগছে। যে তর্ক করতে পারে না, সে নির্বোধ আর যে তর্ক করে না, সে ক্রীতদাস।’ ছাত্ররা তার স্পর্শে স্বপ্নবান হয়ে উঠতে থাকে। ডিরোজিওর প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠে ছাত্ররা। তার শিক্ষার ফলে যে জাগরণ শুরু হয়েছিল তার ফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
ডিরোজিওকে নিয়ে এই বইটিতে তোমরা পাবে কিছু নতুন চিন্তার খোঁজ। বইটি তোমাদের ভালো লাগবে।
এজাজ পারভেজ
