আত্মসমর্পণের বিনিময়ে শান্তি!

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:৫৮ এএম

দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের অঙ্গীকার করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে সময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবেন এমন দাবি করা ট্রাম্প ১০ মাসেও সফল হননি। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা দুপক্ষ বেশ কয়েকবার আলোচনার টেবিলে বসলেও কার্যত কোনো অগ্রগতিই হয়নি। তবে এ যুদ্ধের লাগাম টানতে নতুন একটি শান্তি প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ওই প্রস্তাবে একই সঙ্গে ইউক্রেনকে তাদের সামরিক সক্ষমতা হ্রাসের শর্তও দেওয়া হয়েছে এবং খুব সম্ভবত প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে এ প্রস্তাব মেনে নিতেই হবে, তাকে তেমন ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও বলেছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে প্রস্তুত আছেন। তবে ইউরোপের বেশ কিছু মিত্র দেশ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এ পরিকল্পনাটি রাশিয়ার স্বার্থেই বেশি কাজ করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এবং যুক্তরাজ্যের ফিন্যান্সিয়াল টাইমস গত বুধবার প্রথম এ পরিকল্পনার বিবরণ প্রকাশ করে। রয়টার্স অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র জেলেনস্কিকে ‘ইঙ্গিত’ দিয়েছে, ইউক্রেনকে অবশ্যই এ পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে, যার মধ্যে ভূখণ্ড এবং অস্ত্র সমর্পণ অন্তর্ভুক্ত থাকছে। আরেক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিনিময়ে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টি পাবে। তবে এটি এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি প্রস্তাব নয়। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। এমনকি রাশিয়াও এমন কোনো শান্তি পরিকল্পনার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এ পরিকল্পনা সুনির্দিষ্ট। এতে ২৮টি দফা রয়েছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে রাশিয়া ২০১৪ সালে দখল করা দক্ষিণ ইউক্রেনের ক্রিমিয়া এবং দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক নিয়ে গঠিত পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস অঞ্চলের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাবে।

ইউক্রেনকে দনবাস থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। এটি একটি সেনামুক্ত অঞ্চলে পরিণত হবে, যেখানে রাশিয়াও সেনা মোতায়েন করতে পারবে না। এ পরিকল্পনায় ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর আকার এবং দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমানোর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি সীমা আরোপের কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী,

কৃষ্ণসাগরসংলগ্ন জাপোরিঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলে বিদ্যমান যুদ্ধরেখাগুলো স্থিতাবস্থা করে দেওয়া হবে। এ এলাকার কোনো অংশ ইউক্রেনকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে কি না, তা পরবর্তী আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিকভাবে এ পরিকল্পনা কোনোভাবেই ইউক্রেনের পক্ষে নয়। লন্ডন কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা গবেষণা বিভাগের পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক মারিনা মিরন বলেন, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইউক্রেনকে তার সামরিক বাহিনীর আকার ৬০ শতাংশ কমাতে হবে (চার লাখের বেশি সৈন্য রাখা যাবে না)। মিরন আরও বলেন, ইউক্রেনের এমন কোনো দূরপাল্লার সক্ষমতা থাকবে না, যা রাশিয়ায় আঘাত করতে পারে এবং রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চলগুলো ও ক্রিমিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সামরিক বিশেষজ্ঞ কিয়ের জাইলস এ পরিকল্পনাকে ‘ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয়কর’ বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ, সেনাবাহিনীর আকার হ্রাস এবং অস্ত্রের সীমাবদ্ধতা ইউক্রেনকে ভবিষ্যতে রুশ আক্রমণের সামনে খুব ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। মিরন বলেন, এ পরিকল্পনা স্পষ্টতই রাশিয়ার পক্ষে যায়। এখন দেখার বিষয়, ইউক্রেন ও জেলেনস্কিকে এটি মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে পারে কি না। তবে লন্ডনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের রাশিয়ান সামরিক বিশেষজ্ঞ কিয়ের জাইলস আলজাজিরাকে বলেন, এ প্রস্তাব হয়তো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসেনি। তিনি এ প্রস্তাবের উত্থাপনকে ‘বাস্তবতার ভিত্তি না হয়ে একটি রুশ তথ্যযুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেন।

হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘এক্স’-এ লিখেছেন এ যুদ্ধ অবসানের জন্য উভয়পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে সম্ভাব্য ধারণাগুলোর একটি তালিকা তৈরি অব্যাহত থাকবে এবং স্থায়ী শান্তি অর্জনের জন্য ‘উভয়পক্ষকেই কঠিন হলেও প্রয়োজনীয় ছাড়ের বিষয়ে সম্মত হতে হবে’। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে আলোচনার সময় জেলেনস্কি কথিত এ প্রস্তাব নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি টেলিগ্রামে লিখেছেন, রক্তপাত বন্ধ এবং স্থায়ী শান্তি অর্জনের জন্য প্রধান বিষয় হলো আমাদের সব অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব কার্যকর ও শক্তিশালী থাকা। তবে অপ্রকাশিত এ পরিকল্পনার বিষয়ে জেলেনস্কির কার্যালয় থেকে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে জেলেনস্কির কার্যালয় বলছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আশা করছেন কূটনৈতিক সুযোগ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় মূল দিকগুলো নিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা হবে।

এ পরিকল্পনা নিয়ে এক মাস ধরে কাজ করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। গত সপ্তাহে ফ্লোরিডার মিয়ামিতে ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব রুস্তেম উমেরভের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি ওই বৈঠকে ২৮ দফার পরিকল্পনাটি তুলে ধরেছেন। ইউক্রেনীয় ও রুশ দুপক্ষের জনগণের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্য শর্তগুলো নিয়ে মতামত নেওয়া হচ্ছে বলে গতকাল নিশ্চিত করেছেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। তিনি উদীয়মান এ প্রস্তাবের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, ট্রাম্প এ বিষয়ে তাকে ব্রিফ করেছেন এবং তিনি প্রস্তাবটি সমর্থন করেছেন। লেভিট বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন দুপক্ষের জন্য এটি একটি ভালো পরিকল্পনা। এটি দুপক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত এবং তারা এটি নিয়ে কাজ করছেন বলেও জানান লেভিট। পরে জেলেনস্কি বলেন, তিনি এ পরিকল্পনা নিয়ে কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারি ড্যানিয়েল ড্রিসকলের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তবে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নতুন উদ্যোগকে গুরুত্ব দেবে না বলেই মনে হচ্ছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, এই মুহূর্তে কোনো আলোচনা চলছে না। অবশ্য কিছু তথ্য বিনিময় হচ্ছে। এমন কোনো প্রক্রিয়া চলছে না, যাকে যোগাযোগ বলা যায়।

জেলেনস্কি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি নিয়ে কাজ করার ইঙ্গিত দিলেও ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্ররা এ ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছে। ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেন, ইউক্রেনের মানুষ শান্তি চায়, যা সব দেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে। এমন টেকসই শান্তি চায়, যা ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আগ্রাসনের আশঙ্কা জাগাবে না। তবে শান্তি মানে আত্মসমর্পণ করা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা ক্যালাস বলেন, যেকোনো শান্তি প্রস্তাব কার্যকরের জন্য ইউরোপ ও ইউক্রেনের সমর্থন প্রয়োজন। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোসøাউ সিকোরস্কি বলেন, যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে বলে ইউরোপ প্রত্যাশা করছে। রাশিয়ার হামলার মুখে ইউক্রেনীয় সেনারা দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কূটনৈতিক উদ্যোগে যোগ দিতে জেলেনস্কি চাপের মুখে পড়ছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন গত অক্টোবরে দাবি করেছিলেন, রুশ সেনারা চলতি বছর ইউক্রেনের প্রায় পাঁচ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছেন। গত ২৫ অক্টোবর ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার বলেছে, প্রকৃতপক্ষে ৩ হাজার ৪৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত