নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীবনরেখাই আমাদের সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এজন্য বলা হয়, মাছে-ভাতে বাঙালি। অথচ এই প্রাণদায়ী জলেই এখন মিশে আছে নীরব ঘাতক। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাংলাদেশের নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলের পানিতে মাইক্রো দূষকের (কীটনাশক, ওষুধ এবং ক্যানসার সৃষ্টিকারী পিএফএএস) উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি ঢাকা ওয়াসার সরবরাহকৃত খাবার পানি এবং বাজারের বোতলজাত পানিতেও বিপজ্জনক মাত্রায় মাইক্রোপলুট্যান্টস বা ক্ষুদ্র দূষকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। তাছাড়া দেশীয় মাছ টেংরাতেও এসব দূষক বিদ্যমান। এই দূষকগুলোর মধ্যে রয়েছে ভয়াবহ সব রাসায়নিক, যা মানব স্বাস্থ্যে ডেকে আনছে গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।
রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল গবেষক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রধান নদ-নদী থেকে সংগৃহীত ৭১টি পানির নমুনা, ২৩টি টেংরা মাছের নমুনা এবং ঢাকা ওয়াসার সরবরাহকৃত বিশুদ্ধ খাবার পানি ও বাজারের বোতলজাত ১৬টি পানির নমুনা বিশ্লেষণ করে এসব দূষণের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
গবেষক দল ঢাকার চারপাশের নদী ও দেশের পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্রসহ অন্য নদ-নদীর উজান ও মোহনা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। এ ছাড়াও সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন দ্বীপ এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে নদীর প্রবেশস্থল থেকেও নমুনা সংগ্রহ করেন তারা।
সংগ্রহকৃত নমুনাগুলো সুইডেনের উমিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। যাতে ৩০০ এর অধিক মানব বর্জ্য, কলকারখানার বর্জ্য, অব্যবহৃত ওষুধ অর্থাৎ ফার্মাসিউটিক্যালস দূষণের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রতি লিটারে যার মাত্রা ১০ থেকে ১০ হাজার ন্যানোগ্রাম। নমুনা পানিতে আরও ২০০ প্রকারের রাসায়নিক পদার্থ বা কীটনাশক পাওয়া যায়, যার পরিমাণ ৩০-৪০ হাজার ন্যানোগ্রাম। এসব কীটনাশকের মধ্যে ৪১টির মাত্রা উদ্বেগজনক এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ১৬ ধরনের পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল (পিএফএএস) পাওয়া যায়, যার মাত্রা ছিল ২ হাজার ৯০০ ন্যানোগ্রাম; এরমধ্যে ৭ ধরনের পিএফএএস অতি উচ্চমাত্রা।
সম্প্রতি সুইডেনের উমিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ ও বাংলাদেশের শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) কৃষি রসায়ন বিভাগের গবেষক দলের যৌথ এ গবেষণায় এসব ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। শুধু শীতকালে সংগ্রহকৃত নমুনা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালীন নমুনা বিশ্লেষণ চলমান বলে জানান এ গবেষক দলটি।
আরও উদ্বেগের বিষয় ঢাকা ওয়াসার বিশুদ্ধ খাবার পানিতেও এসব দূষণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ঢাকার উত্তরা, গুলশান, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানম-ি, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁওসহ ৮টি স্থান থেকে ওয়াসার সরবরাহকৃত বিশুদ্ধ খাবার পানিতে বিভিন্ন কীটনাশকের মাত্রা ১৫০-৫০০ ন্যানোগ্রাম। এ ছাড়াও দেশে বহুল প্রচলিত ৮টি বোতলজাত পানি বিশ্লেষণ করে একটিতে ২ হাজার ৭০০ ন্যানোগ্রাম আর ৩টিতে ১০০ ন্যানোগ্রামের ওপরে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল (পিএফএএস) পাওয়া যায়।
এই পিএফএএস রাসায়নিকগুলো ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ হিসেবে পরিচিত, যা পরিবেশে সহজে ভাঙে না এবং মানবদেহে জমা হতে থাকে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএফএএস শরীরে দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া তৈরির ফলে মানবদেহে ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং গর্ভস্থ ভ্রƒণের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাবসহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে।
এ ছাড়াও গবেষকদল দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২৩টি টেংরা মাছের নমুনায় বিপজ্জনক কীটনাশকের উপস্থিতি চিহ্নিত করেন। যেখানে ফার্মাসিউটিক্যালসের মাত্রা ছিল ০.৪৫ থেকে ১৫ হাজার ন্যানোগ্রাম আর কীটনাশকের মাত্রা ০.১ থেকে ১ হাজার ন্যানোগ্রাম। দূষণের এসব মাত্রা বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের নমুনাগুলোয় ছিল তুলনামূলক অনেক বেশি।
গবেষণা দল জানায়, তারা ইতিমধ্যে এসব দূষণের স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন খাল, নদী ও পানীয় জলের উৎসে আরও নমুনা সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে।
