আকাশের অন্ধকারে বিলীন এক অপরাধীর গল্প

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০২:২৮ এএম

১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর, আমেরিকার বিমান ইতিহাসে এক দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও অমীমাংসিত ধাঁধা হয়ে আছে। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এক হাইজ্যাকিংয়ের গল্প, যার প্রধান চরিত্রে ছিলেন এক শান্ত স্বভাবের ভদ্রলোক ডি.বি. কুপার। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

আমেরিকান অপরাধ ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু নাম আছে, যারা শুধু রহস্য নয়; যারা একেকটি কিংবদন্তি। এই তালিকায় সম্ভবত সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হলো ডি.বি. কুপার। ১৯৭১ সালের হেমন্তের এক সন্ধ্যায় তিনি যে দুঃসাহসী হাইজ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ২,০০,০০০ ডলার মুক্তিপণ আদায় করেছিলেন এবং মাঝ-আকাশ থেকে একটি বোয়িং ৭২৭ বিমান থেকে প্যারাসুটে লাফ দিয়ে পালিয়েছিলেন, সেই ঘটনা আজও তদন্তকারী সংস্থা এফবিআইয়ের কাছে এক অমীমাংসিত ধাঁধা। কুপারের পরিচয়, তার পরিণতি এবং তার রেখে যাওয়া সামান্য প্রমাণগুলো কয়েক দশক ধরে গবেষক ও সাধারণ মানুষের কৌতূহলকে টিকিয়ে রেখেছে। এই রহস্যময় হাইজ্যাকার কি বেঁচে ছিলেন, নাকি প্রকৃতির কঠিন খেলায় পরাস্ত হয়েছিলেন সেই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে চলে মানুষ।

উনিশশ একাত্তরের সেই বিকেলে পোর্টল্যান্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি সস্তা টিকিটে সিয়াটলগামী নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৩০৫-এ যাত্রা শুরু করেন এক অচেনা মানুষ। তিনি নিজেকে ড্যান কুপার নামে পরিচয় দেন। সংবাদকর্মীর একটি ভুলের কারণে সিয়াটলের এক স্থানীয় সন্দেহভাজনের নাম মিশে গিয়ে চিরকালের জন্য তিনি পরিচিত হন ‘ডি. বি. কুপার’ নামে।

বিমান উড়ে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই কুপার শান্তভাবে আকাশসেবিকা ফ্লোরেন্স শ্যাফনারকে একটি নোট দেন। নোটে লেখা ছিল, তার কাছে বিস্ফোরক রয়েছে। এরপর তিনি আকাশসেবিকা টিনা মাকলোর মাধ্যমে বিমান কর্র্তৃপক্ষের কাছে তার দাবি জানান দ্ইু লাখ ডলার নগদ টাকা এবং চারটি প্যারাসুট। তার ব্রিফকেসে আটটি ডিনামাইটের মতো বস্তু দেখে বিমান কর্র্তৃপক্ষ বিচলিত হলেও, ঝুঁকি না নিয়ে নির্দেশ মেনে চলার সিদ্ধান্ত নেয়। সিয়াটলে বিমানের অবতরণের পর তাকে অর্থ ও প্যারাসুট দেওয়া হয়। কুপার যাত্রীদের নেমে যাওয়ার অনুমতি দেন এবং শুধু চারজন ক্রু-সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে বিমানটিকে ফের আকাশে ওড়ানোর নির্দেশ দেন।

কুপারের পরবর্তী নির্দেশগুলো প্রমাণ করে যে, বিমান চালনা সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি মেক্সিকো সিটি যাওয়ার নির্দেশ দেন, তবে কিছু বিশেষ উড্ডয়ন শর্তের সঙ্গে ল্যান্ডিং গিয়ার নামানো থাকবে, ফ্ল্যাপস ১৫ ডিগ্রি কোণে থাকবে এবং বিমানকে ১০,০০০ ফুটের নিচে দিয়ে উড়তে হবে। তার এই নির্দেশগুলো ছিল বিমানটির গতি কমানোর কৌশল, যা প্যারাসুটে লাফ দেওয়ার জন্য অপরিহার্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিমানের পেছনের সিঁড়ি আংশিকভাবে প্রসারিত থাকবে। বোয়িং ৭২৭ বিমানের এই বিশেষ সিঁড়িটিই কুপারকে পালানোর সুযোগ দিয়েছিল, যা এই হাইজ্যাকিংকে এক অনন্য মাত্রা দেয়।

সিয়াটল থেকে রিনোর দিকে উড়ে যাওয়ার ঠিক কিছুক্ষণ পরেই আকাশসেবিকা মাকলোকে ককপিটে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং কুপারকে বিরক্ত না করতে বলেন। মাকলো চলে যাওয়ার পর, মাঝ-আকাশের অন্ধকারে, রাত ৮টা ৫ মিনিট থেকে ৮টা ১৫ মিনিটের মধ্যে ঝড়ো বাতাস, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এবং অন্ধকারকে উপেক্ষা করে কুপার সেই ঐতিহাসিক লাফটি দেন। তিনি সঙ্গে নেন সব মুক্তিপণের টাকা এবং দুটি প্যারাসুট। বিমানটি যখন রিনোতে অবতরণ করে, ককপিট থেকে সাবধানে এসে ক্রু-সদস্যরা দেখেন কুপার নেই, পেছনের সিঁড়ি খোলা, এবং তিনি নিঃশব্দে মিলিয়ে গেছেন।

এক অভূতপূর্ব তদন্তের যাত্রা

এই রহস্যের কিনারা করতে গিয়ে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্তগুলোর একটি চালিয়েছিল, যা ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে। এই অফিসিয়াল তদন্তে কুপারের ফেলে যাওয়া কালো ক্লিপ-অন টাই, বিমানের টিকিট, তার হাতে লেখা ছোট নোট এবং ককপিটে পাওয়া ফিঙ্গার প্রিন্ট এগুলো ছিল তদন্তকারীদের প্রাথমিক হাতিয়ার।

সবচেয়ে মূল্যবান প্রমাণ ছিল সেই ডার্ক ক্লিপ-অন টাই। আধুনিক ফরেনসিক বিশ্লেষণে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে টাইটি থেকে বিভিন্ন ধাতব ও রাসায়নিক মাইক্রো-পার্টিকল পাওয়া যায়। এর মধ্যে বিশুদ্ধ টাইটানিয়াম, ক্যালসিয়াম সিলিকেট এবং অন্যান্য বিরল ধাতু ছিল। এই কণাগুলো থেকে গবেষকরা ধারণা করেন যে, কুপার সম্ভবত কোনো এয়ারস্পেস, কেমিক্যাল বা এমনকি কোনো রেল ইয়ার্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেখানে এ ধরনের শিল্প উপাদান ব্যবহার করা হতো, যা তার বিমান সম্পর্কিত জ্ঞান এবং পরিকল্পনার সঙ্গে মিলে যায়।

কিন্তু এত নিবিড় অনুসন্ধান এবং হাজার হাজার সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা সত্ত্বেও, এফবিআই একটি নির্দিষ্ট সন্দেহভাজনকে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার মতো অকাট্য প্রমাণ কখনোই পায়নি। এমনকি, কুপারের ব্যবহৃত আটটি সিগারেটের গোড়া, যা থেকে ডিএনএ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তাও একসময় তদন্তকারীদের হাত থেকে হারিয়ে যায়। এই প্রমাণগুলোর অভাবই রহস্যকে চিরস্থায়ী করে তোলে। তাই ২০১৬ সালে এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে কেসটি ‘নিষ্ক্রিয়’ ঘোষণা করে।

প্রধান সন্দেহভাজন

ডি.বি. কুপারের পরিচয় নিয়ে জল্পনা বরাবরই তুঙ্গে ছিল, যা এই কেসটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কিছু প্রধান সন্দেহভাজন হলেন, রিচার্ড ফ্লয়েড ম্যাককয় : কুপারের ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর ম্যাককয় একই ধরনের হাইজ্যাকিং করেন। তবে ক্রু-সদস্যরা তাকে কুপার হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেননি এবং তার পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে তাকে কুপারের একজন ‘কপি-ক্যাট’ হিসেবে গণ্য করা হয়। রবার্ট র‌্যাকস্ট্র : প্রশিক্ষিত আর্মি প্যারাট্রুপার হলেও তার বয়স এবং চোখের রঙের মতো শারীরিক বর্ণনার অসামঞ্জস্য থাকায় এফবিআই তাকে সন্দেহের তালিকা থেকে সরিয়ে দেয়। কেনেথ ক্রিশ্চিয়ানসেন : সাবেক এই এয়ারলাইন্স কর্মী কুপারের বয়সের সঙ্গে মিললেও, শারীরিক গঠনে ফারাক ছিল এবং অকাট্য প্রমাণের অভাব ছিল।

এই রহস্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার ছদ্মনামের উৎস। কুপার যে চারটি প্যারাসুট চেয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি ছিল অকেজো ‘ডামি-চুট’ বা প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত প্যারাসুট। কুপার সেই ডামি-চুটটি নেন এবং একটি কার্যকর প্যারাসুট ফেলে যান। তিনি যে প্যারাসুটটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটি ছিল সামরিক ধরনের আর ফেলে যাওয়াটি ছিল নাগরিক প্যারাসুট। এই ঘটনা তার সামরিক অভিজ্ঞতা, যেমন একজন প্যারাট্রুপার হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

তার ছদ্মনাম ‘ড্যান কুপার’-এর পেছনেও

সাংস্কৃতিক সূত্র রয়েছে। এটি ফ্রাঙ্কো-বেলজিয়ান কমিকস সিরিজ ‘ড্যান কুপার’-এর প্রধান চরিত্র, যিনি ছিলেন একজন কানাডিয়ান এয়ারফোর্স প্যারাট্রুপার। এই কমিকসটি ১৯৭১ সালে আমেরিকায় না পাওয়া গেলেও কানাডায় জনপ্রিয় ছিল। তাই গবেষকদের ধারণা, কুপার হয়তো কানাডিয়ান ছিলেন অথবা তার সামরিক জ্ঞানের সূত্রপাত কানাডীয় বা ফরাসি ভাষাভাষী কোনো অঞ্চল থেকে।

মুক্তিপণের টাকার রহস্য

তদন্তকারীরা মুক্তিপণের নোটগুলোর সিরিয়াল নম্বর নথিভুক্ত করে রেখেছিলেন, যাতে কেউ তা ব্যবহার করলে তাকে ধরা যায়। কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে সেই টাকার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এরপর ১৯৮০ সালের শুরুতে, ওয়াশিংটন রাজ্যের কলম্বিয়া নদীর ধারে একটি ছোট সৈকতে, যার নাম টিনা বার, ব্রায়ান ইনগ্রাম নামে এক কিশোর বালিতে খেলার সময় তিনটি ক্ষয়প্রাপ্ত বান্ডিলে  ৫,৮৮০ খুঁজে পায়। এফবিআই নিশ্চিত করে যে এই নোটগুলোর সিরিয়াল নম্বর কুপারকে দেওয়া অর্থের সঙ্গে মিলে যায়।

এই আবিষ্কার রহস্যকে আরও জটিল করে তোলে। বান্ডিলগুলো যে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা ছিল, তা এক বছরের বেশি সময় খোলা বাতাসে বা জলে টিকে থাকার কথা নয়। তাই গবেষকদের ধারণা হয়তো কুপার নিজেই বেঁচে ফিরে টাকাগুলো সেখানে পুঁতে রেখেছিলেন। কারণ সঠিক ভৌগোলিক জ্ঞান এবং শারীরিক সক্ষমতা ছাড়া এমন লাফে টিকে থাকা কঠিন হলেও, তিনি টিকে ছিলেন কি না, সে প্রশ্নই আজ পর্যন্ত অমীমাংসিত। নদীর স্রোতও ওই বান্ডিলগুলোকে এমনভাবে বয়ে নিয়ে আসতে পারত না। তাই এই সামান্য পরিমাণ অর্থ পুনরুদ্ধার কুপারের ভাগ্য নাকি ইচ্ছাকৃত মানব হস্তক্ষেপের ফল, তা আজও একটি রহস্য।

সাংস্কৃতিক প্রভাব ও কিংবদন্তির জন্ম

ডি.বি. কুপারের ঘটনা শুধু অপরাধের ইতিহাস নয়; জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। তার দুঃসাহসিকতা এবং আইনের চোখে ধুলো দেওয়ার ক্ষমতা, এসব মিলিয়ে তিনি এক রোমাঞ্চকর প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। মানুষ তাকে স্বাধীনতার প্রতিচ্ছবি, একজন অজানা অভিযাত্রীর রূপ, কিংবা নিছকই একজন সাহসী অপরাধী, নানাভাবে দেখেছে। রহস্যের আকর্ষণই তাকে এক ধরনের আমেরিকান লোককাহিনির নায়কে রূপ দিয়েছে।

আজও নানা গবেষণাপ্রিয় মানুষের বার্ষিক সমাবেশে ‘কুপার সম্মেলন’ (CooperCon) অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পেশাদার অনুসন্ধানকারী থেকে শুরু করে সাধারণ আগ্রহীরা নতুন ফরেনসিক বিশ্লেষণ, পুরনো প্রমাণের পুনরালোচনা এবং আধুনিক ‘ক্রাউড-স্লিউথিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেন। ঘটনাটির প্রযুক্তিগত দিকও টানটান উত্তেজনায় ভরা। যে বিমানটি থেকে তিনি লাফ দিয়েছিলেন, তার পেছনের সিঁড়ি খোলা অবস্থায় মাঝ-আকাশে ঝাঁপ দেওয়া তখন পর্যন্ত প্রায় অকল্পনীয়। রাতের আঁধার, উচ্চতা, প্রবল শীতল বাতাস, আবহাওয়ার বৈরিতা সব মিলিয়ে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সঠিক ভৌগোলিক জ্ঞান এবং শারীরিক সক্ষমতা ছাড়া এমন লাফে টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু তিনি টিকে ছিলেন কিনা, এ প্রশ্নই আজ পর্যন্ত অমীমাংসিত।

কেন এত বছর পরও এই রহস্য টিকে আছে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে মানবমনের গভীরে। মুক্তিপণের বেশিরভাগ অংশ কখনোই ফিরে পাওয়া যায়নি, সন্দেহভাজনদের কেউ-ই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হননি, আর প্রকৃত নাম ও পরিচয় আজও অন্ধকারে। এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার ভেতরেই তৈরি হয়েছে এক কিংবদন্তি। আকাশের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সেই মানুষটির সত্যি পরিচয় হয়তো কোনো দিনই জানা যাবে না, কিন্তু তার ফেলে যাওয়া প্রশ্নগুলো আজও মানুষকে ভাবায়, অনুসন্ধানে টানে আর ইতিহাসের পাতায় তৈরি করে এক অনন্য অভিযাত্রার গল্প।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত