ভূমিকম্প না হলে সেমিনারও হয় না!

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:২৫ এএম

যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটলে নানা ধরনের নির্দেশনা, প্রস্তুতি ও ভবনের মান যাচাই-বাছাই শুরু হয়। নগরীর নিরাপত্তা জোরদার করার এই তৎপরতা কিছুদিন পর থেমে যায়। একইসঙ্গে লাল ফিতায় বাঁধা পড়ে কঠোর সব নির্দেশনা। গত শুক্র ও শনিবার কয়েক দফায় ভূমিকম্পের পর সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নড়েচড়ে বসেছে। ভবনের মান যাচাই এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়েও চলছে জোর আলোচনা।

গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশের (আইইবি) মিলনায়তনে ভূমিকম্প নিয়ে এক সেমিনার আয়োজন করা হয়। এই সেমিনারে ভূমিকম্প সহনশীল নগরী গড়তে নানা মতামত আসে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। এরমধ্যে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অব বাংলাদেশের (আইডিইবি) সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. কবীর হোসেন বলেন, কোনো দুর্যোগ না হলে মানুষ যেমন সচেতন হয় না, তেমনি সংস্থাগুলোও কোনো পদক্ষেপ নেয় না। এমনকি ভূমিকম্প না হলে এই সেমিনারও হতো না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালে সিদ্দিকবাজার এবং সায়েন্স ল্যাবে ভবন ধসের ঘটনা ঘটে। দ্ইু ঘটনায় অন্তত ২১ জন প্রাণ হারান। ২০২৪ সালে বেইলি রোডে রেস্টুরেন্ট ভবনে আগুন লেগে অন্তত ৪৬ জন নিহত হন। তাছাড়া পুরান ঢাকার নিমতলী ও চুড়িহাট্টার ট্র্যাডেজির পর সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সভা, সেমিনার, বক্তৃতা-বিবৃতিতে ব্যস্ত সময় পার পার করেন পেশাজীবীরা। কিন্তু প্রতিটি দুর্ঘটনা শেষ হলেই যেন আলোচনাও মিলিয়ে যায়। এ নিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতির পাশাপাশি ভাটা পড়ে সরকারের পদক্ষেপেরও।

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে এই নগরী কিছুটা হলেও নিরাপদ হতো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হলেও সভা সমাবেশ বা সেমিনার করে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কথাও বলেছেন তারা।

গতকালের সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা জানান, রাজধানীতে ২১ লাখের বেশি ভবন রয়েছে। এরমধ্যে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় কমপক্ষে ৬ লাখ ভবন যাচাই করার পরামর্শ দেন তারা। তাদের মতে, সম্প্রতি ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর কয়েকবার আফটার শক হয়েছে। কিন্তু সামনে বড় ধরনের ভূমিকম্প হবেই। এর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে এখনই সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (আইইবি)-এর সেমিননার হলে ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ হ্রাসে প্রস্তুতি ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারটি আয়োজন করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এতে বক্তব্য দেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ বন ও জলবায়ুপরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম। এ ছাড়া বাংলাদেশ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), স্থপতি ইনস্টিটিউট, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ এর প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়োট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন বিশ্বিবিদ্যালয়ের ভূমিকম্প ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ও গবেষক, রিহ্যাব প্রতিনিধি, ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি, বিভিন্ন সোসাইটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. মেহেদী হাসান আনসারী বলেন, কয়েক বছর আগে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করার উদ্যোগটা এখন বাস্তবায়ন করতে হবে। সব ভবন যাচাই করা যাবে না। এলাকাভিত্তিক কমপক্ষে ৬ লাখ ভবন যাচাই করতে হবে। কোন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বেশি, কোন এলাকায় কম সেগুলো মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে এই উদ্যোগ থার্ড পার্টিকে দিয়ে করাতে হবে। আর যেগুলোতে সমস্যা ধরা পড়বে, সেগুলো ভাঙার প্রয়োজন হলে অবশ্যই করতে হবে। ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিতেই হবে।

তিনি আরও বলেন, মানুষকে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি জলাশয় ভরাট করে ভবন নির্মাণ থেকে বিরত থাকতে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, রাজধানীর ভবনগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজে রাজউক ও সিটি করপোরেশনকে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির অজুহাতে এ কাজে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। জননিরাপত্তার স্বার্থে রাজউককে এটা করতে হবে। প্রয়োজনে রাজউককে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

রাসায়নিক গুদাম পুরান ঢাকাকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করেছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানকার প্রায় প্রতিটি বাসায় ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যালের কারখানা আছে। এখন পর্যন্ত সরানোর কোনোরকম কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। স্থায়ীভাবে দ্রুত সময়ে এসব গুদাম সরিয়ে নিতে হবে। এখানে ব্যবসায়ীরা হ্যাঁ বলুক, না বলুক, তার থেকে অনেক বেশি জরুরি হচ্ছে মানুষ।

উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাসে জনগণের প্রস্তুতির পাশাপাশি সরকারি সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। এ ছাড়া টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট জারি করা হচ্ছে। সেখানে রাজউককে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের তদারকি জোরদার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ কঠোরভাবে অনুসরণের জন্য রাজউককে নির্দেশনা দেন তিনি।

রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, একটি নিরাপদ ও আধুনিক নগর গড়ে তুলতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী, ভবন মালিক, ডেভেলপারসহ সব অংশীজনের সম্মিলিত সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। ভূমিকম্প সচেতনতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তিনি ভূমিকম্পসহ সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় অংশীজনের সহযোগিতা কামনা করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত