প্রয়োজন এখন ভূমিকম্প গবেষণা ইনস্টিটিউট। বিশ্বের সব দেশেই এমন ইনস্টিটিউট থাকলেও আমরা পিছিয়ে আছি। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের পৃথক একটি উইংয়ের মাধ্যমে ভূমিকম্পের উপাত্ত সরবরাহ করা হলেও ঘাটতি রয়েছে গবেষণায়। ঘন ঘন ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণায় এমন একটি ইনস্টিটিউটের প্রয়োজন বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নরসিংদীতে গত শুক্রবার ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে ঢাকা আশপাশের এলাকায় প্রাণহানি ও অনেকে আহত হওয়ার পর ভূমিকম্প গবেষণা নিয়ে দাবি উঠেছে। নরসিংদীতে পরপর তিন দফা ভূমিকম্প কেন হলো? এই এলাকায় যে একটি ফল্ট লাইন রয়েছে, তা আমরা আগে জানতে পারিনি কেন? এ ছাড়া এই এলাকা ছাড়া দেশের অন্য কোথাও আরও ফল্ট লাইন রয়েছে কি না কিংবা নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে কি না? দেশের ভেতরে দুই বা তিন মাত্রার সব ভূমিকম্প আমরা রেকর্ড করতে পারছি কি না? যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে কিংবা ভারতে ইনস্টিটিউট অব সিসমোলজির উপাত্তে বড় আকারের ভূমিকম্প রেকর্ড হলেও মৃদু আকারের ভূমিকম্পের উপাত্ত কি আমরা পাই? এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কথা হয় দেশের ভূতত্ত্ববিদ ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে।
অনেক মৃদু ভূমিকম্প রেকর্ড হয় না : ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাধ্যমে চট্টগ্রামের আমবাগানে প্রথম স্থাপিত হয়েছিল ভূকম্পন পর্যবেক্ষণাগার। এ সেন্টার থেকেই সারা দেশের ভূমিকম্পের তথ্য সরবরাহ করা হতো ২০০৬ সাল পর্যন্ত। পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে দেশের ঢাকার আগারগাঁওয়ে, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুরে চারটি ভূকম্পন কেন্দ্র স্থাপনের পর ঢাকার কেন্দ্রটিকে প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনায় আনা হয়। এখানেই সারা দেশের ভূমিকম্পের উপাত্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসে এবং উপাত্ত সরবরাহ করা হয়। পরে ২০১৫ সালে রাজশাহী, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, পঞ্চগড়সহ ছয়টি জেলায় এবং ২০১৭ সালে খাগড়াছড়ি, নেত্রকোনা ও বরিশালে তিনটি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এসব কেন্দ্র থেকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া সব ভূমিকম্প রেকর্ড করা সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বর্তমানে এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে ভূমিকম্পের রেকর্ড পেয়ে থাকি। কিন্তু মৃদুমাত্রার সব ভূমিকম্প রেকর্ড পাওয়ার জন্য দেশের ভেতরে কমপক্ষে আরও ২০টি ভূমিকম্প কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, তখন ৩৩টি ভূকম্পন কেন্দ্রের তথ্যগুলো অটো সফটওয়্যার সিস্টেমের মাধ্যমে আরও নিখুঁত উপাত্ত পাওয়া যাবে। অর্থাৎ ১০০ কিলোমিটার পরপর কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে বিভিন্ন পকেটে (ব্লকে) উৎপত্তি হওয়া মৃদু ভূমিকম্পগুলোর রেকর্ড পাওয়া যাবে। তখন এসব উপাত্ত ব্যবহার করে ভূমিকম্প গবেষণার মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে।
প্রয়োজন একটি সিসমোলজি ইনস্টিটিউটের : ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ভূমিকম্প গবেষণায় ভূতত্ত্ববিদ, সিসমোলজিস্ট, জিও আর্থ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পাস করে আসা শিক্ষার্থীদের কাজ করার কথা। আর এজন্য ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের আদলে ন্যাশনাল সিসমোলজি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা যায়। এই ইনস্টিটিউট দেশের ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করবে। এখানে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা যুক্ত থাকতে পারে। একই সঙ্গে সিসমিক হ্যাজার্ড নিয়ে যারা কাজ করে, ইঞ্জিনিয়ারিং সিসমোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং জিওফিজিকস, আর্থকোয়েক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং জিওটেকনিক্যাল আর্থকোয়েক ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে যারা পড়াশোনা করে আসবে তারা এখানে জব করবে।
তিনি আরও বলেন, গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে যে সভা হয়েছে আমাদের সঙ্গে, সেখান থেকে লিখিত পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। এমন একটি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার জন্য আমি আমার সুপারিশে উল্লেখ করব।
এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, দেশে একটি আর্থকোয়েক রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রয়োজন। সেই ইনস্টিটিউট গবেষণার কাজ যেমন করবে তেমনিভাবে ভূমিকম্প শিক্ষার প্রসারেও কাজ করবে। দেশের স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে আর্থ সায়েন্স, ভূতত্ত্ব ও ভূমিকম্প বিষয়ে কিছু অধ্যায় যুক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতেও কাজ করা যেতে পারে। গবেষণার কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে আর্থকোয়েক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘মাটির নিচের কোথায় ফল্ট লাইন আছে? কত গভীরে আছে? এগুলো কখন কেঁপে উঠবে, তা আমার জানার বিষয় নয়। আমি জানি কীভাবে বিল্ডিং করলে ভূমিকম্প সহনীয় করে গড়ে তোলা যায়। কিন্তু এর জন্য তো আমার ভবনটি ভূমিকম্পের কোনো ফল্ট লাইনে কিংবা ভূমিকম্পের জোনে আছে কি না, জানতে হবে। সেজন্য অবশ্যই সঠিক উপাত্ত ও রিসার্চের বিকল্প নেই।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বক্তব্য : অবশ্যই দেশে ভূমিকম্প গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা প্রয়োজন উল্লেখ করে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তবে এ ইনস্টিটিউট আবহাওয়া অধিদপ্তরের অধীনে একটি পৃথক উইংয়ের মাধ্যমে গড়ে তোলা যেতে পারে। আর তা করা গেলে ভূমিকম্প গবেষণায় গতি আসবে। এই ইনস্টিটিউটে ভূতত্ত্ববিদ, ইঞ্জিনিয়ারিং সিসমোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং জিওফিজিকস, আর্থকোয়েক ইঞ্জিনিয়ারিংসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোর জনবল নিয়োগের মাধ্যমে আমরা একটি আধুনিক ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে পারি।’
বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজারবার ভূমিকম্প হয়। এর মধ্যে বছরে ১০০ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে। এই ১০০ ভূমিকম্পের মধ্যে কিছু ভূমিকম্প ধ্বংসলীলায় খুব মারাত্মক হয়ে থাকে। পৃথিবীতে সাতটি বড় প্লেটের পাশাপাশি অনেক ছোট প্লেট রয়েছে। এই প্লেটগুলো প্রতিনিয়ত গতিতে রয়েছে এবং ফলে প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে। আমাদের দেশের পূর্ব পাশ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী হয়ে একটি ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মা প্লেটের ফল্ট লাইন রয়েছে, যা সিলেটের উত্তর প্রান্ত হয়ে হিমালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ফল্ট লাইনের কারণে ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে প্রায়ই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। সেগুলো আবার মাটির অনেক গভীরে হয়ে থাকে।
