সৃষ্টির সেবার মধ্যেই স্রষ্টার সন্তুষ্টি নিহিত। সৃষ্টির সেবা করার অন্যতম উপায় হলো পরোপকার। পরোপকারে মনুষ্যত্বের প্রকৃত বিকাশ ঘটে। ইসলামে এই নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন বা স্বেচ্ছাসেবার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জান্নাত লাভের অন্যতম সোপান। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মুমিনদের জনকল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং রাসুল (সা.) একে সদকা বা পুণ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন স্বেচ্ছাসেবক কেবল দুনিয়াবি স্বার্থে কাজ করেন না, বরং তার মূল লক্ষ্য থাকে মহান রবের সন্তুষ্টি হাসিল করা। নবী-রাসুল ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শে স্বেচ্ছাশ্রমের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রোথিত আছে, তা আমাদের জন্য অনুকরণীয়।
স্বেচ্ছাসেবক কোনো আর্থিক বা সামাজিক স্বার্থের জন্য কাজ করে না, স্বার্থহীন মানবসেবাই এখানে মুখ্য। একজন বিশ্বাসী স্বেচ্ছাসেবকের আসল লক্ষ্য থাকে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কোরআন-হাদিসে স্বেচ্ছাশ্রমের ব্যাপক উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়েছে। কোরআনে স্বেচ্ছাসেবার গুরুত্ব বোঝাতে এটিকে নিজের জন্যই কল্যাণকর হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন মহান আল্লাহ। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর।’ (সুরা বাকারা ১৮৪)
স্বেচ্ছাসেবা ও মানুষের উপকার করা মুমিনের অন্যতম গুণ। ইমানের পাশাপাশি মানবসেবায় ব্রতী হওয়াও সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমে মুখ করবে। বরং বড় সৎকর্ম হলো ইমান আনবে আল্লাহর ওপর, কেয়ামত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং নবী-রাসুলদের ওপর। আর সম্পদ ব্যয় করবে তারই মহব্বতে আত্মীয়স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির-ভিখিরি ও মুক্তিকামী দাসের জন্য।’ (সুরা বাকারা ১৭৭)
সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী ও স্বেচ্ছাসেবী মানসের অধিকারী। পবিত্র কোরআনে তাদের পরস্পরকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা এসেছে। অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া উৎকৃষ্ট মানের স্বেচ্ছাসেবা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুহাজিরদের আগমনের আগে মদিনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে, মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, তার জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদের অগ্রাধিকার দেয়। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।’ (সুরা হাশর ৯)
পবিত্র কোরআনে উল্লিখিত জুলকারনাইনের প্রাচীর নির্মাণের ঘটনা স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য শিক্ষা। জুলকারনাইন এক জনপদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানকার লোকজন প্রতিবেশী ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল। তারা জুলকারনাইনের কাছে একটি প্রাচীর বানিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়। বিনিময়ে অর্থ দিতে চাইলে জুলকারনাইন তা নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং স্বেচ্ছাসেবা হিসেবে তাদের কাজ করে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা বলল, হে জুলকারনাইন, ইয়াজুজ-মাজুজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্য মোটা অঙ্কের বিনিময় ধার্য করব এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন। তিনি বললেন, আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তাই যথেষ্ট।’ (সুরা কাহফ ৯৪-৯৫)
মুসা (আ.)-এর স্বেচ্ছাসেবার কথাও কোরআনে আলোচিত হয়েছে। দুজন নারীর অসহায়ত্বে তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে এগিয়ে এসেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তিনি মাদইয়ানের কূপের ধারে পৌঁছালেন, তখন কূপের কাছে একদল লোক পেলেন তারা জন্তুদের পানি পান করাচ্ছিল এবং তাদের পেছনে দুজন নারী দেখলেন তারা তাদের জন্তুদের আগলে রাখছে। তিনি বললেন, তোমাদের কী সমস্যা? তারা বলল, আমরা আমাদের জন্তুদের পানি পান করাতে পারি না, যে পর্যন্ত রাখালরা তাদের জন্তুদের নিয়ে সরে না যায়। আমাদের পিতা খুবই বৃদ্ধ। তখন মুসা তাদের জন্তুদের পানি পান করালেন।’ (সুরা কাসাস ২৪)
রাসুল (সা.)-এর হাদিস এবং সাহাবিদের জীবন থেকে স্বেচ্ছাসেবার অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যয়। মদিনা রাষ্ট্রের পরতে পরতে সাহাবায়ে কেরামের স্বেচ্ছাশ্রমের দাগ লেগে আছে। মসজিদে নববি নির্মিত হয়েছিল মুসলিম সমাজের স্বেচ্ছাশ্রমে। খন্দকের যুদ্ধে সাহাবিদের সঙ্গে স্বয়ং রাসুল (সা.) পরিখা খননে যোগ দেন। ইসলামের যেকোনো সংকটে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের জান-মাল অকাতরে বিলিয়ে দেন। দুনিয়ার কোনো স্বার্থের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি, মানবসেবা এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য তারা এসব স্বেচ্ছাশ্রম করেছেন।
স্বেচ্ছাসেবার গুরুত্ব বর্ণনা করে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যত দিন সূর্য উদিত হবে মানুষের প্রতিটি আঙুলের হাড় তথা ছোট কাজই সদকা। দুই ব্যক্তির মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে ফয়সালা করা সদকা। বাহনে উঠতে সাহায্য করা সদকা। বাহনে কারও মালামাল উঠিয়ে দেওয়া সদকা। ভালো কথা বলা সদকা। নামাজের জন্য যাওয়ার পথের প্রতিটি পদক্ষেপ সদকা। পথ দেখিয়ে দেওয়া সদকা। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা সদকা।’ (সহিহ বুখারি ২৮৯১)
ইসলামের প্রথম যুগের সংকটকালে দাওয়াতি কাজ পরিচালনার জন্য সাহাবি যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) নিজের বাড়ি দান করে দেন। রাসুল (সা.)-এর হিজরতের দিন আলি (রা.) নিজের প্রাণের পরোয়া না করে মানুষের আমানত ফিরিয়ে দিতে মক্কায় রয়ে যান। অসহায় মানুষের সেবা করার কারণে জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.)-কে রাসুল (সা.) ‘আবুল মাসাকিন’ বা ‘দুস্থদের পিতা’ আখ্যা দেন। বিশিষ্ট নারী সাহাবি রুফাইদা (রা.) আহতদের জন্য ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল নির্মাণ করেন। এসব ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষা।
স্বেচ্ছাসেবা আমাদের যোগ্যতা, দক্ষতা এবং নেতৃত্বগুণ বৃদ্ধি করে। মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়ার সুযোগ এনে দেয়, যা আমাদের পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত করে। স্বেচ্ছাসেবীরা সফল হবে উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা রুকু করো, সেজদা করো, তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত করো এবং সৎকাজ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা হজ ৭৭)
স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য রয়েছে আল্লাহর সাহায্য। রাসুল (সা.) বলেন, ‘বান্দা তার ভাইকে যতক্ষণ সাহায্য করে, আল্লাহ ততক্ষণ তাকে সাহায্য করে থাকেন।’ (সহিহ মুসলিম ২১৪৮)
স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার জান্নাত। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে মুসলমান অপর মুসলমানকে বস্ত্রহীন অবস্থায় পেয়ে বস্ত্র দান করে, মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতে সবুজ পোশাক পরাবেন। খাদ্য দান করলে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন, পানি পান করালে জান্নাতের শরবত পান করাবেন।’ (আবু দাউদ ১৭৫২)
আল্লাহর আনুগত্য মেনে মানবতার কল্যাণে স্বেচ্ছাসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা মুমিনের দায়িত্ব। তাই আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে স্বেচ্ছাসেবায় এগিয়ে আসি এবং নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার
