যে মানুষ বানাতেন অদ্ভুত সব বাড়ি

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:২৯ এএম

ফ্র্যাঙ্ক গেহ্রি ছিলেন সেই বিপ্লবী স্থপতি, যিনি ভবনকে জ্যামিতির কঠোর বাঁধন থেকে মুক্ত করে ভাস্কর্যের মতো রূপ দিয়েছিলেন। স্থাপত্যকে এক নতুন দৃশ্যমান ভাষা দেওয়া এই কিংবদন্তি শিল্পী সম্প্রতি ৯৬ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। তাকে  নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

এক বিপ্লবী চরিত্রের প্রয়াণ

ফ্র্যাঙ্ক ও. গেহ্রি সমসাময়িক স্থাপত্যের পরিমণ্ডলে এই নামটি এক গভীর, বহুমাত্রিক কম্পনের মতো। তার বিদায় শুধু একজন স্থপতির প্রয়াণ নয়, বরং স্থাপত্যচিন্তার এক বিপ্লবী অধ্যায়ের সমাপ্তি। তিনি শুধু ভবন নির্মাণ করেননি; তিনি প্রচলিত স্থাপত্যকাঠামোর বিরুদ্ধে এক শিল্পিত বিদ্রোহকে রূপ দিয়েছেন, যা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তার মৃত্যুসংবাদ বিশ^জুড়ে স্থাপত্যপ্রেমী, শিল্পানুরাগী ও নগরবিশারদদের হৃদয়ে শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, কারণ তিনি সেই স্থপতি, যিনি ভবনকে দেখেছেন স্থির, জড় কাঠামো নয়, বরং জীবন্ত, বহমান এক শিল্পকর্ম হিসেবে, যার ভেতর রূপ, অনুভূতি ও গতির জটিল সমন্বয় রয়েছে। গেহ্রির ঐন্দ্রজালিক স্পর্শে ইট-পাথরের ভবনগুলো হয়ে উঠত বিশাল, অপ্রত্যাশিত ভাস্কর্য, যে ভাস্কর্য আবার মানুষের শহুরে অভিজ্ঞতাকে, শহরের আত্মাকে নতুন করে বদলে দিত। তিনি সপ্রমাণ করেছিলেন, একটি ভবন শুধু আশ্রয় নয়; এটি বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারে, চিন্তা উসকে দিতে পারে এবং একটি শহরের আত্মাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা রাখে। স্থাপত্যের এই নাট্যকার পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও, তার নির্মিত প্রতিটি বক্ররেখা, প্রতিটি ঝলমলে ধাতব পৃষ্ঠতল স্থাপত্যের ইতিহাসকে নতুন করে লেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে।

তরলতা ও গতিশীলতার কবি

গেহ্রির স্থাপত্য-দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এক গভীর দার্শনিক অবস্থান : তরলতা, গতিশীলতা এবং প্রচলিত জ্যামিতির ইচ্ছাকৃত বিকৃতি। স্থাপত্যে তিনি চিরায়ত স্থির রেখা, পূর্বনির্ধারিত আকার এবং কঠোর নিয়মের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, একটি ভবনও মানুষের মতো আবেগ ধারণ করতে পারে; তারও এক ধরনের গতিশীল জীবন আছে, যা সময়, আলো ও পরিবেশের সঙ্গে নিরন্তর বদলে যায়। তার কাজ ছিল সেই জীবনকে মূর্ত করে তোলা। তার নকশায় ব্যবহৃত ধাতব পৃষ্ঠতল, যেমন টাইটানিয়াম বা ইস্পাত এমনভাবে বাঁকানো ও সজ্জিত যে, তা আলো প্রতিফলনের মাধ্যমে দিনের প্রতিটি মুহূর্তে নতুনরূপ নেয়। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় এক রকম, আবার সূর্যাস্তের রক্তিম আভায় অন্যরকম। গভীর বক্ররেখা এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ জ্যামিতির ব্যবহার তার নকশার ভাষায় এক উচ্ছ্বাস তৈরি করে, যা দেখলে মনে হয় ভবনটি যেন স্থির নয়, বরং গলে যাচ্ছে, উঠে আসছে বা বাতাসের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এটি যেন এক স্থাপত্যের কবিতা, যা স্থানুর বিপরীতে স্রোতের জয়গান গায়। এই দার্শনিক অবস্থান তাকে প্রচলিত স্থাপত্যের ঘেরাটোপ ভেঙে এক ভাস্কর্য-ভিত্তিক স্থাপত্যধারার পথিকৃৎ করে তোলে। তার নকশায় ভবন কেবল কার্যকারিতা বা উপযোগিতার দাস থাকে না, বরং সৌন্দর্য, নাটকীয়তা ও গভীর মানবিক অনুভূতির ধারক হয়ে ওঠে। গেহ্রি আমাদের শেখালেন, একটি দেওয়াল শুধু একটি সীমা নয়, এটি একটি ক্যানভাস; একটি ছাদ কেবল আচ্ছাদন নয়, এটি আকাশের সঙ্গে কথা বলার একটি মাধ্যম।

ভাস্কর্য মেশে জ্যাজ সংগীতে

ফ্র্যাঙ্ক গেহ্রির শিল্পীসত্তা গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন মাধ্যমের পারস্পরিক সংযোগ ও গভীর নিরীক্ষা থেকে। তিনি কেবল স্থাপত্য-বিষয়ক বইপত্র বা নকশার ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নেননি, বরং মনোযোগ দিয়েছেন ভাস্কর্য, সংগীত, বিশেষত জ্যাজ এবং দৈনন্দিন জীবনের অপ্রত্যাশিত বস্তুর দিকে। এই বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই তার কাজকে এতটা স্বতন্ত্র করে তুলেছে। ভাস্কর্য তাকে শিখিয়েছে ত্রিমাত্রিক ফর্মকে তার বাঁধাধরা নিয়ম থেকে মুক্ত করে বাঁকানোর সাহস; জ্যাজ সংগীত তাকে দিয়েছে কাঠামোর ভেতরেও স্বাধীনতা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও তাৎক্ষণিকতার অনুশাসন। জ্যাজের মতো, তার স্থাপত্যও যেন নকশার মূল ভিত্তি মেনেও, মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত মোচড় বা স্বরলিপি তৈরি করে। তার কাছে ফর্মের মুক্তি ছিল শিল্পের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। মাছের বক্রতা তার ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস। তিনি প্রায়ই বলতেন, মাছের গতির ভেতর তিনি মুক্তির রূপ খুঁজে পান, যা মসৃণ, শক্তিমান এবং অনিবার্যভাবে গতিশীল। টাইটানিয়াম বা ইস্পাতের বাঁকানো ফর্মে সেই গতির স্মৃতি লুকিয়ে থাকে। তার স্থাপনাগুলো তাই অনেক সময়ই তরঙ্গ, পাল বা সাঁতার কাটতে থাকা মাছের মতো দেখায়। এমনকি তার প্রথম দিকের কাজগুলোতে তিনি ঢেউ খেলানো ঢেউতোলা কার্ডবোর্ড বা তারের জালের মতো সস্তা উপাদান ব্যবহার করে ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেছিলেন। এই বহুমাত্রিক প্রেরণা তার কাজকে করেছে নাটকীয়, দৃষ্টি-আকর্ষণকারী, আবার একই সঙ্গে গভীরভাবে শিল্পসম্মত। তার ভবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এটি কেবল কোনো প্রকৌশলী বা নকশাবিদের কাজ নয়, বরং একজন শিল্পীর দীর্ঘ চর্চা, এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি ও ফর্মের ওপর একচ্ছত্র দখলের চূড়ান্ত ফল।

স্মরণীয় স্থাপত্য

গেহ্রি তার কর্মজীবনে এমন কিছু স্থাপনা তৈরি করেছেন, যা শুধু স্থাপত্য নয়, নগর-পরিকল্পনার ইতিহাসে এক স্থায়ী পরিবর্তন এনেছে।

গুগেনহাইম মিউজিয়াম : স্পেনের বিলবাও শহরে গেহ্রির এই জাদুঘরকে আধুনিক স্থাপত্যের এক সিংহদ্বার বলা যায়। বক্র টাইটানিয়ামের পৃষ্ঠ যেন আলোকে নিজের ভাষায় পুনর্লিখন করে, দিনের বিভিন্ন সময়ে ভবনের রঙ ও টেক্সচার পরিবর্তন করে। ভবনের আকার এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যেন নদীর ধারায় ভেসে চলা কোনো জাহাজ বা একদল ফুল, যা দেখলে মনে হয় এটি নদীর তীরে স্থিত নয়, বরং গতিশীল। তবে এটি শুধু আলোড়ন তোলা স্থাপনা নয়, এর প্রভাব একটি শহরের ইতিহাসই বদলে দেয়। ‘বিলবাও ইফেক্ট’ এই শব্দটি বিশে^ প্রতিষ্ঠিত হয় গেহ্রির হাত ধরেই। একটি ভবন কীভাবে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের কেন্দ্র হতে পারে, তার সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ এটি। একসময়ের শিল্প-বিমুখ, ম্রিয়মাণ শহর বিলবাও এই ভবনের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটন, শিল্পচর্চা ও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, যা প্রমাণ করে স্থাপত্য শুধু শিল্প নয়, এটি এক অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিও বটে।

ওয়াল্ট ডিজনি কনসার্ট হল, লস অ্যাঞ্জেলেস : যেখানে সংগীত বাজে, সেখানে স্থাপত্যও যেন সুর তুলতে পারে এই ধারণার সবচেয়ে সুন্দর বাস্তবায়ন এই কনসার্ট হল। বাইরের স্টেইনলেস স্টিলের ধাতব বাঁকগুলো যেন সংগীতের ঢেউ বা কোনো অর্কেস্ট্রার ছন্দকে মূর্ত করে তুলেছে। ভেতরের অ্যাকুস্টিক নকশা এতটাই পরিমার্জিত যে, এটি বিশ্বমানের সংগীতশিল্পীদের প্রিয় মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যা বাইরের নাটকীয়তার সঙ্গে ভেতরের ব্যবহারিক উৎকর্ষের এক নিখুঁত সমন্বয়।

গেহ্রির নকশা এখানে এক ধরনের দৃশ্যমান কবিতার মতো, শহরের ভেতরে একটি নতুন দৃশ্যমান হৃদস্পন্দন তৈরি করেছে এই হল। এটি লস অ্যাঞ্জেলেসকে শুধু সাংস্কৃতিকভাবে নয়, স্থাপত্যগতভাবেও নতুন পরিচিতি দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে ক্লাসিক্যাল সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট করতে সাহায্য করেছে।

ড্যান্সিং হাউস, প্রাগ : ঐতিহাসিক ও চিরায়ত স্থাপত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাগের ড্যান্সিং হাউস যেন নগর স্মৃতির ভেতর একটি রম্য, অপ্রত্যাশিত বাঁক। দুটি টাওয়ারের ভঙ্গিমা দেখে মনে হয় তারা নাচছে একজন দৃঢ় পাথরের তৈরি পুরুষ, অন্যজন কাঁচ ও বক্ররেখায় তৈরি তরল নারী। স্থানীয় নাম ‘ফ্রেড ও জিঞ্জার’ প্রসিদ্ধ জুটি ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার ও জিঞ্জার রজার্স-এর প্রতি শ্রদ্ধা।

এই ভবন প্রমাণ করে, স্থাপত্য সবসময় গুরুগম্ভীর বা স্মৃতিস্তম্ভের মতো হতে হবে না, এটি আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে, চমক দিতে পারে এবং মানুষের দৈনন্দিন পথচলায় একটি খেলাচ্ছলে বিরতি ঘটাতে পারে। এটি গেহ্রির সেই ক্ষমতাকে তুলে ধরে, যেখানে তিনি স্থানীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তার পরীক্ষামূলক ফর্মকে সফলভাবে মিশিয়ে দিতে পারতেন।

স্থাপত্যজগতে বিতর্ক

গেহ্রির কাজ সর্বদাই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এটাই তার শক্তির অন্যতম উৎস ছিল। কেউ তাকে দেখেছেন স্থাপত্যে বিপ্লব আনা একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিল্পী হিসেবে। তারা মনে করেন, গেহ্রি সেই ব্যক্তি, যিনি দেখিয়েছেন, ভবন একটি স্বাধীন শিল্পমাধ্যম হতে পারে। তারা তাকে স্থাপত্যের রেনেসাঁসের প্রবক্তা হিসেবে গণ্য করেন। আবার সমালোচকরা বলতেন, তার ভবন ‘অতিরিক্ত নাটকীয়’, ‘অকারণে ব্যয়বহুল’ এবং ‘কার্যকারিতার তুলনায় বাহ্যিকতায় বেশি মনোযোগ দিয়েছে।’ তারা প্রশ্ন তুলতেন, এ ধরনের জটিল নকশার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও টেকসইতা নিয়ে। অনেক সময় তার নকশার কারণে ভেতরের স্থানের ব্যবহার কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ত বলে অভিযোগ ছিল। কিন্তু এই বিতর্কই গেহ্রিকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে। তার নকশাগুলো মানুষকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে একটি ভবন শুধু কীভাবে দাঁড়াবে, তা নয়; এটি কেমন অনুভূতি তৈরি করবে। তিনি স্থাপত্যকে নীরব থেকে সরিয়ে, জনপরিসরের আলোচনার বিষয় করে তুলেছেন, যা স্থাপত্যের ভবিষ্যতের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল।

প্রযুক্তির ভূমিকা

ফ্র্যাঙ্ক গেহ্রি সেই স্থপতি, যিনি প্রযুক্তিকে দেখেছেন একটি শিল্পীসত্তার সহযোগী হিসেবে, কোনো বাধা হিসেবে নয়। জাহাজ নির্মাণের শিল্পে ব্যবহৃত সফটওয়্যার সিএটিআইএ (ঈঅঞওঅ) ব্যবহার করে তিনি স্থাপত্যে ডিজিটাল মডেলিংয়ের পথ খুলে দেন। তার বক্র, অনিয়মিত ও জটিল ফর্মগুলো প্রচলিত নকশায়, অর্থাৎ কাগজ-কলমে সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে তৈরি করা ছিল কার্যত অসম্ভব। কিন্তু এই অত্যাধুনিক কম্পিউটার-সহায়ক ডিজাইন সফটওয়্যারই তাকে দিয়েছে যথার্থতা, কাঠামো ও তার কল্পনার বাস্তবায়নের সাহস।

ডিজিটাল প্রযুক্তি গেহ্রির হাতে হওয়া নির্মাণকে শুধু বাস্তব করেছে না, স্থাপত্যশিক্ষায়ও এক মাইলস্টোন হয়ে থেকেছে। আজকের অনেক পরীক্ষামূলক স্থাপত্য তার প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, উচ্চ-প্রযুক্তি এবং উচ্চ-শিল্প পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক হতে পারে। এই প্রযুক্তিগত দক্ষতা তাকে ‘কাগজ-স্থপতি’ থেকে ‘বাস্তবায়নকারী স্থপতি’ হিসেবে এক নতুন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল।

ফ্র্যাঙ্ক গেহ্রির রেখে যাওয়া প্রভাব ভবিষ্যতের স্থাপত্যকে বহু দশক ধরে নির্দেশনা দেবে। তিনি স্থপতিদের শিখিয়েছেন নিয়ম মানা জরুরি, কিন্তু তার বাইরে প্রশ্ন করাও জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত