আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে ভিন্ন বা বিরোধী মতাবলম্বীদের অপহরণ ও গুম করে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) নির্যাতনের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করতে আবেদন করেছে প্রসিকিউশন। এতে শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং ১১ জন সেনা কর্মকর্তাও আসামির তালিকায় রয়েছেন।
গতকাল রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ প্রসিকিউশনপক্ষে শুনানি শেষ করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। প্রসিকিউশনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষের শুনানির জন্য আগামীকাল মঙ্গলবার দিন ধার্য করে।
এদিন শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ২৬ জনকে গুম করে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) পরিচালিত জেআইসিতে ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অপহরণ ও গুমের নির্দেশ দিতেন শেখ হাসিনা। আর তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা কার্যকর করতে বলতেন তারিক আহমেদ সিদ্দিক।
এ মামলায় কারাগারে থাকা তিন আসামি মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও আহমেদ তানভীর মাজাহার সিদ্দিকীকে গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের উপস্থিতিতে শুনানি হয়। পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক। পলাতক এই পাঁচজন ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন। পলাতকদের তালিকায় আরও আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক। এ মামলায় প্রধান আসামি শেখ হাসিনা, দ্বিতীয় আসামি তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন।
গোপন বন্দিশালায় ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ
শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বিগত স্বৈরশাসকের আমলে গুমের যে সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল, সেটা করা হয়েছিল ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী ও নিরঙ্কুশ করার জন্য। তিনি বলেন, ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তরের দক্ষিণ পাশে মেস-বি’র মধ্যে একটি দোতলা ভবনে ছোট ছোট খোপের মতো বন্দিশালা ছিল। এতে মোটা রডের গ্রিল ও ঢাকনা দেওয়া আছে। ভেতরে কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই। প্রত্যেকটি সেলের ভেতরে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। ছোট ভেন্টিলেটর ছিল। সেখানে এগজস্ট ফ্যান চালানো থাকত। যখনই আজান হতো বা বাইরে কোনো শব্দের কারণে বন্দিরা এটা কোন জায়গা তা যেন শব্দ শুনে বুঝতে না পারেন, সেজন্য করিডোরে থাকা এগজস্ট ফ্যানগুলো তীব্র শব্দ করত, সেগুলো চালিয়ে দেওয়া হতো। কখনো কখনো সাউন্ডবক্সে উচ্চ শব্দে গান-বাজানো হতো। ফলে অসহ্য শব্দে অনেকে বধির হয়েছেন।
অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, বন্দিরা বাইরের কোনো আওয়াজ শুনতে পেতেন না। যদি কোনো বন্দি এগজস্ট ফ্যান চালানোর আগেই হয়তো মসজিদের মাইক থেকে আজানের শব্দ শুনেছেন। কখনো জুমার খুতবা শুনেছেন। কিংবা ওই এলাকার কোনো ব্যক্তি ইন্তেকাল করেছেন বলে মাইকে শুনেছেন, এই শব্দ নিয়ন্ত্রণের পরও তা থেকে বন্দিরা বুঝতে পেরেছেন যে এটা ডিজিএফআইয়ে এই জায়গায় অবস্থিত একটি সেল।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বন্দিশালায় ২০-২৫ জন বন্দি সবসময় থাকতেন। সবার ব্যবহারের জন্য বাথরুমের সামনে একটা নোংরা গামছা টানিয়ে রাখা হতো। এই একটা গামছা দিয়েই সবাই হাত-মুখ মুছতে হতো, গোসলের সময়ও সেটি ব্যবহার করতে হতো। সেই থেকে অ্যালার্জি, খোসপাঁচড়াসহ নানা চুলকানি রোগে আক্রান্ত হতেন বন্দিরা। একই গামছা ব্যবহারের কারণে বন্দিদের চোখ উঠত। তিনি বলেন, ‘বন্দিশালায় একটি টুথব্রাশ রাখা হতো। সেই ব্রাশটি ২৫ জনকে ব্যবহার করতে বলা হতো। একটা মানুষকে কতটা অমানবিক পরিবেশে রাখা যায়, তার ব্যবস্থা বন্দিশালাগুলোতে ছিল। আদালতে বলেছি, এই বন্দিশালার ভিডিও আমরা তুলে এনেছি। এগুলো উপস্থাপন করে দেখানো হবে যে, কতটুকু নিষ্ঠুর ছিল ওই বন্দিশালাগুলো।’
