স্থগিত হলো ২১ অফডকের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট। বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর করতে না পারায় আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা। তবে গতকাল বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বিকডার ত্রিপক্ষীয় সভায় ধর্মঘট কর্মসূচি এক মাসের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, তা কেটে গেল।
কর্মসূচি স্থগিতের কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ও সংস্থাটির মুখপাত্র ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাদের (বিকডা) কর্মসূচি এক মাসের জন্য স্থগিত রাখতে অনুরোধ করা হলে তারা সম্মত হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আমরা তাদের দাবিগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করব।’
এক মাস স্থগিতের বিষয়ে বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম কাস্টমসের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কর্মসূচি এক মাসের জন্য স্থগিত করেছি। তবে আমরা তিনটি দাবি দিয়েছি। এ সময়ের মধ্যে আমাদের দাবিগুলো মেনে নিতে হবে। যদি মেনে নেওয়া না হয়, তাহলে আবারও হয়তো কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।’
কী দাবি দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে রুহুল আমিন শিকদার বলেন, ‘আমরা তিনটি দাবি দিয়েছি। প্রথমত, বিকডার ট্যারিফ বৃদ্ধি নিয়ে উচ্চ আদালতে দুটি রিট করা হয়েছে, এ রিট দুটি প্রত্যাহার করে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অযৌক্তিক ট্যারিফ কমিটি একপেশে হয়েছে, তাই এ কমিটি বিলুপ্তি করতে হবে। তৃতীয়ত, ট্যারিফ কতটা বাড়া উচিত তা নির্ধারণ করে প্রয়োগ নিশ্চিত করে দিতে হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে এ দাবিগুলো মেনে নেওয়ার জন্য আমরা বলেছি।’
এর আগে ট্যারিফ বৃদ্ধি নিয়ে আদালতের রিটের জবাবে তা স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তাই এ আদেশের কারণে অফডক মালিকরা ট্যারিফ বৃদ্ধি কার্যকর করতে পারছিলেন না বলে আজ বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। এর আওতায় খালি কনটেইনার ও রপ্তানিমুখী কনটেইনারের সব কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা ছিল। কনটেইনার স্টাফিং, গ্রাউন্ড রেন্ট, লিফট অফ-লিফট অন, ডকুমেন্টশন এবং বন্দর থেকে অফডকগামী যানবাহনের পরিবহন চার্জ সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর করার ঘোষণা দিয়ে এসেছিল বিকডা। কিন্তু অফডক ব্যবহারকারীদের বাধার মুখে, সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কার্যকর করার পর আদালতের আদেশে তা স্থগিত হয়ে গিয়েছিল।
বিরোধিতা কোথায় ছিল? : বিকডার বর্ধিত চার্জকে অযৌক্তিক দাবি করে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশন তা আদায় করা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। শুধু লিখিতভাবেই নয়, পরবর্তীকালে বর্ধিত হারে যাতে ট্যারিফ আদায় করতে না পারে, সেজন্য আদালতে রিট মামলাও করা হয়েছে।
বিজিএমইএর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খান স্বাক্ষরিত বিকডা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রস্তাবিত রিভাইজড চার্জের ক্ষেত্রে আগের হার থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। দুটি ক্ষেত্রে নতুনভাবে চার্জ আরোপ করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এভাবে চার্জ বৃদ্ধি করা বিধিসম্মত নয়। তৎকালীন বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকডার চার্জ বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। এখন যদি বিকডাও চার্জ বাড়ায় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য।’ বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেছিলেন, ‘এখন কি জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে? নাকি অন্য কিছুর দাম বেড়েছে? কোন যুক্তিতে তাদের এ মুহূর্তেই চার্জ বাড়াতে হবে?’ গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘এভাবে একতরফা চার্জ বৃদ্ধির চিঠি না দিয়ে অফডক ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে চার্জ নির্ধারণ করতে হবে।’
অর্থাৎ, সব সেবাগ্রহীতারা বিকডার চার্জ আদায়ের বিরোধিতা করে আসছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ লাখ ৭৭ হাজার রপ্তানি এবং ২ লাখ ৬৫ হাজার আমদানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে বেসরকারি অফডকগুলোতে। নতুন ট্যারিফ কার্যকর হলে বছরে খরচ বাড়বে অন্তত প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। আর এজন্যই বাড়তি ট্যারিফ নিয়ে আপত্তি বিজিএমইএসহ অফডক ব্যবহারকারীদের। তবে বাড়তি এ ট্যারিফ কিন্তু শুধু রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে।
বিকডার বক্তব্য কী ছিল? : ২০১৬ সালে হ্যান্ডলিং চার্জ নির্ধারণের পর ২০২১ সালের নভেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে কনটেইনার ওঠানামাসহ সব ধরনের কাজে ২৩ শতাংশ চার্জ বাড়িয়ে দিয়েছিল অফডক মালিকদের সংগঠন বিকডা। আর এবার চার্জ বাড়ানোর জন্য পরিচালন খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে। এ বিষয়ে বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদারের বক্তব্য ছিল, ‘প্রকৃতপক্ষে ২০১৬ সালের পর এই প্রথম আমরা হ্যান্ডলিং দর বৃদ্ধি করেছি। দীর্ঘ এ সময়ে আমাদের পরিবহন খরচ বেড়েছে প্রায় শতভাগ, শ্রমিকদের খরচ বেড়েছে ২১ থেকে ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য খরচও রয়েছে। তাই এবার আমরা বাধ্য হয়ে হ্যান্ডলিং খরচ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিলাম, যা ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
কত বাড়ানো হয়েছিল? : বেসরকারি এই ২১টি অফডকে বর্তমানে ২০ ফুট সাইজের একটি কনটেইনারের স্টাফিং প্যাকেজ ৬ হাজার ১৮৭ এবং ৪০ ফুট সাইজের জন্য ৮ হাজার ২৫০ টাকা আদায় হলেও প্রস্তাবিত বাড়তি দরে তা ৯ হাজার ৯০০ এবং ১৩ হাজার ২০০ টাকা। একইভাবে বন্দর হয়ে অফডকের কনটেইনারের পরিবহন খরচ ২০ ফুট সাইজের জন্য ১ হাজার ৫০০ এবং ৪০ ফুট সাইজ ৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ ও ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে গ্রাউন্ড রেন্ট, লিফট অন-লিফট অফ, ডকুমেন্টেশনের পাশাপাশি স্টোররেন্ট বাড়ছে কনটেইনারপ্রতি ৩০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে দেখা যায়, একটি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে গড়ে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা করে বাড়তে পারে বলে বিকডার পক্ষ থেকে জানানো হয়।
বন্দরের ওপর চাপ কমাতে ১৯৯৬ সাল থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল বেসরকারি অফডকের। প্রথম পর্যায়ে খালি কনটেইনার, দ্বিতীয় পর্যায়ে রপ্তানি, সবশেষ ৬৫ ধরনের আমদানি পণ্য এবং শতভাগ রপ্তানি পণ্য পরিবাহিত হয়েছে এই ২১টি অফডকের মাধ্যমে।
