আওয়ামী লীগবিহীন এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটে বিএনপিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে চায় জামায়াত। যদিও ভোটের রাজনীতিতে তাদের অতীত খুব একটা সুখকর নয়। সর্বশেষ ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলায় মাত্র একটি আসনে তারা জয়ী হয়েছিল। এরপর আর জয়ের মুখ দেখা হয়নি। এতদিন নির্বাচনে মূল লড়াইটা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর হিসাব পাল্টে গেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতের নির্বাচনে সিলেটে জামায়াত তৃতীয় কিংবা চতুর্থ দল হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এবার বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াত। বিএনপি প্রার্থীরাও সেটা মাথায় রেখেই ভোটের মাঠে সরব রয়েছেন।
জামায়াতের একাধিক নেতা জানান, দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বাড়ি সিলেটে হওয়ায় এখানে তার একটি আলাদা প্রভাব ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। আর সেটাকে নির্বাচনে কাজে লাগাতে চান সিলেটের প্রার্থীরা। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জামায়াতের জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলেও তারা মনে করেন। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে একাধিক আসনে তারা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
অন্যদিকে বিএনপি নেতারা জানান, ভোটের মাঠে জামায়াতকে মোকাবিলা তাদের জন্য খুব একটা কঠিন হবে না, এমনটিই তারা মনে করছেন। তবে দলের ভেতরে কিছু কোন্দল-অনৈক্য নিয়ে চিন্তিত প্রার্থীরা। মনোনয়নবঞ্চিত নেতা ও তাদের অনুসারীরা মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কতটা কাজ করবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সিলেট জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে তিনটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। এ ছাড়া খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ ইসলামপন্থি অন্য দলগুলো ও বাসদ নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে জাতীয় পার্টি রয়েছে নীরব। তাদের কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
সিলেট-১ : সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসনটি মর্যাদার আসন হিসেবে পরিচিত। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এ আসনে সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু দল তাকে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী করেছে। তাই আরিফুল হক চৌধুরীর অনুসারী নেতাকর্মীদের পক্ষে টানা নিয়ে মুক্তাদিরের দুশ্চিন্তা রয়েছে।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান। এর আগে তিনি সিলেট-৬ আসনে দুবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জিততে পারেননি। এবার নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন আসনে তিনি প্রার্থী হয়ে ভোটের মাঠে অবিরাম ছুটে চলছেন। এখানে এনসিপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন দলের সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এহতেশাম হক।
নির্বাচন প্রসঙ্গে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘ধানের শীষকে বিজয়ী করতে সবাই ঐক্যবদ্ধ। একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু রাতের ভোটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সেই বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছিল। আশা করি এবার আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত।’
মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ভোটের প্রচারে গিয়ে জনগণের ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছি। মানুষ অতীতের দ্বিদলীয় রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তারা এবার জামায়াতকেই বেছে নেবে বলে আমরা আশাবাদী।’
সিলেট-২ : বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির এমপি ছিলেন গুম হওয়া নেতা এম ইলিয়াস আলী। জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সিলেট অঞ্চলে বিএনপিতে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর এ আসনে তৎপর হন তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। এবার দল তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। তবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও এখানে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিছুদিন আগে তাকে দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব করা হয়েছে। তার অনুসারীরা মনে করেন, মনোনয়নের পরিবর্তে দলে বড় পদ উপহার পেয়েছেন হুমায়ুন। মনোনয়ন নিয়ে হুমায়ুনের অনুসারীরা লুনার বিপক্ষে তৎপর থাকলেও আপাতত নীরব রয়েছেন। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ আবদুল হান্নান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা আমির উদ্দিন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের হোসাইন আহমদ প্রার্থী হিসেবে তৎপর রয়েছেন।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, ‘উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে এ নির্বাচনী এলাকায় ইলিয়াস আলীর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। তার অনুপস্থিতিতে আমাকে প্রার্থী হতে হয়েছে এবং আমি আশাবাদী সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এখানে ধানের শীষকে বিজয়ী করবে।’
জামায়াত প্রার্থী আবদুল হান্নান বলেন, ‘সন্ত্রাস, দুর্নীতিমুক্ত এলাকা গড়তে ভোট চেয়ে মানুষের কাছে যাচ্ছি এবং ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আশা করি ভোটের ফল আমাদের পক্ষে আসবে।’
সিলেট-৩
দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীসহ অন্তত অর্ধডজন নেতা মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পান যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিক। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচার ও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার মূল্যায়ন হিসেবে তিনি এই মনোনয়ন পেয়েছেন বলে তার অনুসারীরা মনে করেন। মনোনয়ন নিয়ে এ আসনে দলে যে অসন্তোষ ছিল, তা কাটিয়ে উঠতে এমএ মালিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ। জনপ্রতিনিধি হিসেবে ও মাঠ পর্যায়ের নেতা হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। এনসিপি এখানে প্রার্থী করেছে প্রবাসী নেতা ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদকে।
বিএনপির প্রার্থী এমএ মালিক বলেন, ‘এখানে মনোনয়ন নিয়ে আর কোনো অসন্তোষ নেই। সবাই এখন ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ।’
জামায়াতের লোকমান আহমদ বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে অতীতেও সততা-নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছি। আশা করছি এবারও মানুষ আমাকে বেছে নেবে।’
সিলেট-৪
সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরীসহ আরও একাধিক নেতা এখানে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। নগর ছেড়ে সীমান্তে গিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী দলের মনোনয়নবঞ্চিত অন্য নেতা ও তাদের অনুসারীদের কাছে টানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, এনসিপির প্রার্থী প্রবাসী নেতা রাশেল উল আলম, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সাঈদ আহমদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুহাম্মদ আলী, খেলাফত মজলিসের মাওলানা আবুল হাসনাত, মাওলানা নাজিম উদ্দিন কামরান, আলী হাসান উসামা প্রার্থী হিসেবে তৎপর রয়েছেন।
বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমি উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। সিলেট নগরবাসী তা দেখেছেন। এখন উন্নয়নবঞ্চিত একটি এলাকায় প্রার্থী হয়েছি। আমি আশাবাদী এলাকার উন্নয়নের জন্যই এখানকার মানুষ আমাকে বিজয়ী করবে।’
জামায়াত প্রার্থী জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এ নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন সময় বহিরাগত প্রার্থী এসে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন কিন্তু এলাকার কোনো উন্নয়ন হয়নি। এবার উন্নয়নের জন্যই জনগণ স্থানীয় প্রার্থীকে ভোট দেবে বলে আমি আশাবাদী।’
সিলেট-৫
কানাইঘাট-জকিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৫ আসনে বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও দল কাউকেই মনোনয়ন দেয়নি। এ নিয়ে দলে ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক এখানে প্রার্থী হতে পারেন। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে রয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান, বিএনপি নেতা আশিক উদ্দিন চৌধুরী, মাহবুবুল হক চৌধুরী, প্রবাসী নেতা জাকির হোসাইন, ফাহিম আল ইসহাক চৌধুরী প্রমুখ। জামায়াত থেকে এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন জেলা নায়েবে আমির আনোয়ার হোসেন খান। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের মুফতি রেজাউল করিম, খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা আবুল হাসান, মুফতি ফয়জুল হক প্রমুখ প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
সিলেট-৬
গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৬ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। এ আসনে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এনামুল হক চৌধুরী, বিএনপি নেতা ফয়সল আহমদ চৌধুরী, আবুল কাহের শামীমও মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ফয়সল চৌধুরী একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন, তাই তার অনুসারীরা আশাবাদী ছিলেন এবারও তিনি মনোনয়ন পাবেন। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের আজমল হোসেন, খেলাফত মজলিসের মাওলানা আবদুল আজিজ, মাওলানা রফিকুল ইসলাম প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘মনোনয়ন নিয়ে এখন আর কোনো ক্ষোভ-অসন্তোষ নেই। ধানের শীষকে বিজয়ী করতে সবাই কাজ করছেন।’
জামায়াতের প্রার্থী সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘অতীতের জনপ্রতিনিধিরা এই এলাকার উন্নয়নে কাজ করেননি। উন্নয়নের নামে দুর্নীতি হয়েছে। আশা করি এবার মানুষ সৎ প্রার্থীকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন।’
