নাটক, মডেলিং আর নাচ-তিন মাধ্যমেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন সাবিলা নূর। পর্দায় তার সবচেয়ে বড় শক্তি অভিনয় দক্ষতা। চরিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়া, সংলাপের চেয়ে চোখের ভাষায় অনুভূতি প্রকাশ এবং সাবলীল অভিনয় তাকে সমসাময়িক অভিনেত্রীদের ভিড়ে আলাদা করে চিনিয়ে দিয়েছে। ছোট পর্দায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার পর বড় পর্দায় পা রেখেও তিনি দেখিয়েছেন আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি।
রায়হান রাফী পরিচালিত ‘তাণ্ডব’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর নতুন সিনেমা নিয়ে বেশ কিছুদিন নীরব ছিলেন সাবিলা নূর। তবে সেই নীরবতা ভাঙল নতুন ছবির ঘোষণায়। আসছে ঈদুল ফিতরে মুক্তি লক্ষ্য করে নির্মিত হচ্ছে তানিম নূর পরিচালিত সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। এই ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি। ইতিমধ্যে সিনেমাটির দৃশ্যধারণ শুরু হয়েছে।
নতুন সিনেমায় অভিনয় তার কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত একটি সিনেমায় কাজ করাকে এই অভিনেত্রী ক্যারিয়ারের বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন। তার ভাষায়, ‘তাণ্ডব’ সিনেমায় অভিনয়ের পর একটু বিরতি ছিল। আবার সিনেমার কাজে ফিরেছি। ফিরেই ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমায় এত গুণী শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া ভীষণ রোমাঞ্চকর। ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসটি আমার অনেক পছন্দের। এ উপন্যাসের বিশেষ একটি চরিত্রে অভিনয় করছি। এটি নিয়ে আর বিস্তারিত বলতে চাই না। দর্শকের প্রত্যাশা পূরণে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টাই থাকবে।’
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি নির্মিত হচ্ছে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে। এই ছবিতে সাবিলার সঙ্গে অভিনয় করছেন চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, শরিফুল রাজ, শ্যামল মাওলা, জাকিয়া বারী মম, আজমেরী হক বাঁধনসহ আরও অনেকে। শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীদের এই সমন্বয় ছবিটি নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন সাবিলা।
এই সিনেমার কারণে সিয়াম আহমেদের বিপরীতে অভিনীত আরেকটি ছবি ‘রাক্ষস’ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এই তারকা অভিনেত্রী। বিষয়টি নিয়ে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দুটি সিনেমার শুটিং শিডিউল একই সময়ে পড়ায় একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব ছিল না। যেহেতু ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর জন্য আগে কমিটমেন্ট দেওয়া ছিল, তাই সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেই এই ছবিটি বেছে নিয়েছেন তিনি। তার মতে, দুটি সিনেমাতেই চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে শুটিং প্রয়োজন। পেশাদারিত্বের জায়গা থেকেই একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও সাবিলা নূর বেশ সক্রিয়। সর্বশেষ বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার ছোটগল্পের বই ‘ভালোবাসা অতঃপর’। এর আগেও ‘হৃদিকা’, ‘পারাপার’ ও ‘মুখোমুখি অন্ধকার’ এই তিনটি নাটকের গল্প লিখে লেখক হিসেবে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। অভিনয়ের মতো লেখালেখিতেও তার ভাবনার গভীরতা স্পষ্ট।
নদী, পাহাড় আর প্রকৃতির টানেই সময়-সুযোগ পেলেই ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন এই অভিনেত্রী। নতুন সিনেমায় কাজ শুরুর আগে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে গিয়েছিলেন দূরদেশ জর্জিয়ায়। কাজের প্রয়োজনে শুটিংয়ের জন্য দেশের বাইরে গেলেও ব্যক্তিগত ভ্রমণকে তিনি আলাদা গুরুত্ব দেন। সম্প্রতি বিয়ে বার্ষিকী উপলক্ষে স্বামী নেহাল সুনন্দ তাহেরের সঙ্গে ১০ দিনের ভ্রমণে ঘুরে এসেছেন তিনি। ভ্রমণ শেষে নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে সাবিলা নূর বলেন, ‘সারা বছর কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। দু’দণ্ড সময় পেলে আমি হারিয়ে যাই ভ্রমণের আনন্দে। জর্জিয়া যাওয়ার ইচ্ছা অনেক দিনের ছিল, আর সেখানে গিয়ে বুঝেছি, সিদ্ধান্তটা একদম ঠিক ছিল।’
সাবিলা নূর আরও বলেন, ‘জর্জিয়ার প্রতিটি জায়গায় ইতিহাস, প্রকৃতি আর মানুষের আন্তরিকতা একসঙ্গে মিশে আছে। স্টেপান্টসমিন্ডার পাহাড় কিংবা বাতুমির সমুদ্র সবকিছুরই আলাদা গল্প রয়েছে।’
বাতুমি শহরের আধুনিক স্থাপত্য, সমুদ্রতট ও প্রাণবন্ত পরিবেশ তাকে অন্যরকম অভিজ্ঞতা দিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় খাবার, বিশেষ করে হাচাপুরি ও স্থানীয় চায়ের স্বাদও উপভোগ করেছেন এই অভিনেত্রী। তার ভাষায়, জর্জিয়া এমন একটি দেশ, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম, প্রকৃতি ও আধুনিকতা একসঙ্গে মিলে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য স্মরণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
পেছনে তাকালে ২০২৫ সাল সাবিলা নূরের জন্য বেশ স্মরণীয়। নাটকে নিয়মিত অভিনয় থেকে অনেকটাই সরে এসে এই বছরেই তার চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু। তবে ছোট পর্দাকে একেবারে বিদায় জানাননি তিনি। বিশেষ উৎসব আয়োজনে থাকে তার উজ্জ্বল পর্দা উপস্থিতি। চলিত বছরও ভালো কিছু কাজ দিয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি মডেলিং, নামিদামি পণ্যের প্রচারণায় বছর জুড়ে তিনি ছিলেন বেশ সরব।
চলতি বছর শাকিব খানের সঙ্গে ‘তাণ্ডব’ সিনেমায় অভিনয় এবং ঈদুল আজহায় মুক্তির পর দর্শকদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসাকে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের বড় প্রাপ্তি মনে করেন। বিশেষ করে ‘লিচুর বাগানে’ গানটি তাকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। নিজের অর্জন নিয়ে সাবিলা নূরের উপলব্ধি ‘মেগাস্টার শাকিব খানের সঙ্গে সিনেমায় কাজ করা এবং মুক্তির পর দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কাছ থেকে দেখা এই অভিজ্ঞতাই বছরটিকে আলাদা করে তুলেছে। চলচ্চিত্র জগতে পা রেখে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি’।
নতুন সিনেমা, সাহিত্যচর্চা এবং অভিনয়ের পরিণত ধাপে পৌঁছানো সব মিলিয়ে সাবিলা নূর এখন এক নতুন যাত্রায়। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর যাত্রী হয়ে তিনি যে বড় পর্দায় নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইছেন, সে ইঙ্গিত স্পষ্ট। দর্শক এখন অপেক্ষায়, এই যাত্রার পরের স্টেশনগুলো কীভাবে তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
