প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের পর অনিশ্চিত সময়ে বিচার বিভাগই ছিল একমাত্র কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেছেন, ‘জুলাই বিপ্লব সংবিধানকে উল্টে দেওয়ার প্রস্তাব করেনি, বরং এর সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততাকে শুদ্ধ করার প্রস্তাব করেছিল।’
গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে দেওয়া বিদায়ী সংবর্ধনার সময় এমন মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি। সকাল সাড়ে ১০টায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ১ নম্বর বিচারকক্ষে (প্রধান বিচারপতির এজলাস) এ বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হয়।
গণঅভ্যুত্থানে গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১০ আগস্ট দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
সংবিধান অনুযায়ী, ২৭ ডিসেম্বর তার বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হবে এবং ওইদিন তিনি অবসরে যাবেন। তবে ওই সময় সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটির (২১ থেকে ৩১ ডিসেম্বর) কারণে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চ বসবে না। এ কারণে এজলাসে গতকালই ছিল প্রধান বিচারপতির শেষ কর্মদিবস।
গতকাল প্রধান বিচারপতিকে দেওয়া বিদায়ী সংবর্ধনার সময় এজলাসে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন বিপুলসংখ্যক আইনজীবীও। অনুষ্ঠানের শুরুতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষে সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রধান বিচারপতিকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনিশ্চিত সময়গুলোতে বিচার বিভাগের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সেই সময় বিচার বিভাগ ছিল একমাত্র কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যা সংবিধানের সীমার ভেতরে থেকেই নাগরিক অধিকার রক্ষায় দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছে।’ তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ নিশ্চিত করেছে, এ সীমার মধ্যে কোনো অধিকারকে অলীক করে তোলা হবে না, কোনো প্রতিষ্ঠানকে বন্দি করা হবে না এবং কোনো নাগরিককে পরিত্যক্ত করা হবে না।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাংবিধানিক আদর্শের প্রতি অটল থেকে আমরা প্রমাণ করেছি ন্যায়বিচারের শক্তি কোনো একক পদে নয়, বরং আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকারেই নিহিত।’ তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র যতদিন আমাদের মূল মূল্যবোধ হিসেবে থাকবে, সুপ্রিম কোর্ট ততদিন ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করবে।’
আইনজীবীদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘শুধু মক্কেলের সেবা নয়; আদালতের সামনে সত্য তুলে ধরা এবং ন্যায়বিচারে সহায়তা করাই তাদের দায়িত্ব।’ তিনি বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে দরিদ্র ও বঞ্চিতদের আইনি সহায়তাকে এখনো অনেকেই দান হিসেবে দেখেন।’
প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্যে করে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “আপনি উত্তরাধিকার সূত্রে এমন এক বিচার ব্যবস্থা পেয়েছিলেন যেখানে ‘আইনের শাসনের’ পরিবর্তে ‘সুবিধার শাসন’ ঝেঁকে বসেছিল। গত ১৬ মাসে আপনি ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক সততার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। আপনি আমাদের কাছে এসেছিলেন এক উত্তপ্ত বিপ্লবের ঋতুতে আর বিদায় নিচ্ছেন বিজয়, শান্তি ও স্বচ্ছতার এক অনন্য ঋতুতে। আপনি যে স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং বিচার বিভাগীয় সংস্কারের বীজ বুনে দিয়ে যাচ্ছেন, আমরা তাকে মহীরূহে পরিণত করব, ইনশাআল্লাহ।”
সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি নাগরিকদের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। সমাজের সব স্তরে বৈষম্য দূর করার ব্যাপারে আপনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দায়িত্ব পালনের সময় আপনি কোনো আইনজীবীর সঙ্গে কখনো দুর্ব্যবহার করেননি।’
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। গতকাল দুপুরে বঙ্গভবনে এ সাক্ষাৎ হয়। সে সময় রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি কর্তৃক দেশের বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রীকরণের জন্য নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের প্রশংসা করেন। প্রধান বিচারপতির অক্লান্ত চেষ্টায় বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠারও ভূয়সী প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি।
