ঢাকার ধানমণ্ডিতে অবস্থিত ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে গভীর রাতে সংঘটিত হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ছায়ানট। একই সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত দোষীদের শনাক্ত করে শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) গভীর রাতে একদল অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ছয়তলা ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে হামলা চালায়। ভবনের প্রায় প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়, চালানো হয় লুটপাট এবং একাধিক স্থানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং আগুন নেভান। সে সময় র্যাবও ভবন চত্বরে উপস্থিত ছিল।
পরদিন শুক্রবার দুপুরে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শনে যান। তিনি হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ছায়ানট কর্তৃপক্ষকে জানান, ভবনের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি পূরণে সরকার আগ্রহী। এর পরদিন শনিবার সার্বিক ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ উল্লেখ করে ধানমণ্ডি থানায় একটি মামলা দায়ের করে ছায়ানট।
ওসমান হাদির মর্মান্তিক মৃত্যুকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এ হামলা চালানো হয়েছে—এমন ধারণা থাকলেও, ওই ঘটনার সূত্র ধরেই সংস্কৃতি-ভবনে আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে ছায়ানট মনে করে না। বরং বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী একটি গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে বলে তাদের ধারণা। এরই মধ্যে ওসমান হাদির জানাজা ও দাফন যথাযথ মর্যাদায় সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ভবনের নিরাপত্তায় বিভিন্ন সময়ে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
ছায়ানট জানিয়েছে, জন্মলগ্ন থেকেই সংগঠনটি কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। গত ছয় দশক ধরে সংগীত ও সংস্কৃতির চর্চা ও বিস্তারের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সমাজ গঠনে কাজ করে আসছে ছায়ানট। পাশাপাশি সংস্কৃতিনির্ভর সাধারণ শিক্ষার লক্ষ্যে প্রায় দুই দশক ধরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনাও করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ছায়ানট ভবনে হামলার একই রাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের শামিল বলে মনে করছে ছায়ানট। এ ছাড়া ডেইলি স্টার ভবন চত্বরে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে হেনস্তার ঘটনাতেও তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। ১৯ ডিসেম্বর শনিবার রাতে উদীচী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকেও একইভাবে নিন্দা জানিয়েছে ছায়ানট।
এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক ও নিয়মিত কার্যক্রমে ফিরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তবে ক্ষতিগ্রস্ত জরুরি সামগ্রী মেরামত ও নতুন করে সংগ্রহের আগে তা সহজ হবে না বলে জানানো হয়েছে। এরপরও নির্ধারিত অনুষ্ঠানগুলো আয়োজন করা সম্ভব হবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ছায়ানট।
ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে হামলার পর দেশ-বিদেশের প্রাক্তনী, শিক্ষার্থী ও অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীর উদ্বেগ ও সহমর্মিতার বার্তায় সংগঠনটি অভিভূত হয়েছে। অনেকেই ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আর্থিক সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে ছায়ানট জানিয়েছে, এটি একটি স্বনির্ভর স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং একান্ত প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত খাত ছাড়া নিয়মিত কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা গ্রহণে তারা অভ্যস্ত নয়। সংগঠক, প্রাক্তনী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত শক্তিতে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তাদের বিশ্বাস।
সবশেষে ছায়ানট বলেছে, সমাজ ও সংস্কৃতির এই সংকটময় সময়ে সর্বস্তরের মানুষের পরামর্শ ও সংহতি অত্যন্ত জরুরি। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি ও সংগীতচর্চার ধারাবাহিক যাত্রায় ছায়ানট অবিচল থাকবে।
হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার
আজ বিক্ষোভ মিছিল করবে ইনকিলাব মঞ্চ