কুয়েতে চৌদ্দগ্রামের যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:২৭ পিএম

কুয়েতে মো. শাহজাহান রনি (২৫) নামে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। রোববার (২১ ডিসেম্বর) দুপুরে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. নূরুল আমিনের মাধ্যমে তার মৃত্যুর সংবাদ পরিবারের কাছে পৌঁছে।

নিহত শাহজাহান রনি চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের কমলপুর গ্রামের মো. তোফায়েল আহমেদ ও নাছিমা বেগম দম্পতির একমাত্র সন্তান। তবে পরিবারের দাবি, এটি কোনো স্বাভাবিক বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু নয়; বরং তার প্রতিবেশী ও কুয়েতে থাকা বাঙালি মালিক মীর হোসেন পরিকল্পিতভাবে রনিকে হত্যা করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৭ মাস আগে পাশের বাড়ির বাসিন্দা মীর হোসেনের মাধ্যমে কুয়েতে যান শাহজাহান রনি। সেখানে কুয়েতের সাবা আল-নাসের এলাকায় মীর হোসেনের একটি বাকালা (গ্রোসারি) দোকানে মাসিক বেতনে চাকরি করতেন তিনি। চাকরির সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রনির সঙ্গে মীর হোসেনের বিরোধ চলছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দেশে থাকা দুই পরিবারের মধ্যেও একাধিকবার ঝগড়া-বিবাদ হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

নিহতের পরিবার জানায়, গত ৪ ডিসেম্বরের পর থেকে রনির সঙ্গে তাদের আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। দীর্ঘ ১৭ দিন নিখোঁজ থাকার পর প্রশাসনের মাধ্যমে তারা রনির মৃত্যুর সংবাদ পান। এ সময় অভিযুক্ত মীর হোসেন রনির পরিবারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন স্বজনরা। তিনি পরিবারকে জানিয়েছিলেন, রনি কুয়েতের জেলে আছে এবং শিগগিরই দেশে ফিরে আসবে।

নিহত রনির বাবা মো. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ করে মীর হোসেনের মাধ্যমে আমার একমাত্র ছেলেকে কুয়েতে পাঠাই। সেখানে চাকরির সময় নানা অজুহাতে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।’

তিনি আরও জানান, গত ৩ ডিসেম্বর ভোরে রনি তার মাকে ফোন করে বলেছিল, ‘মা, মীরু আমাকে বাঁচতে দেবে না।’ ওই কথোপকথনই ছিল মায়ের সঙ্গে তার শেষ কথা। এরপর যোগাযোগ না পেয়ে কুয়েতে থাকা রনির বন্ধু রাকিবকে বাসায় পাঠানো হলে সেখানে খাবার ও এলোমেলো কাপড়চোপড় পাওয়া গেলেও রনির কোনো সন্ধান মেলেনি।

পরবর্তীতে গত ১৩ ডিসেম্বর মীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, রনি জেলে আছে। পরে আবার যোগাযোগ করলে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে সমস্যা হবে’ এবং দাবি করেন রনি তার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে।

চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুয়েতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে শাহজাহান রনির মৃত্যু সংক্রান্ত একটি চিঠি পৌর প্রশাসক মো. নূরুল আমিনের সরকারি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়। 

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৪ ডিসেম্বর কুয়েতের জাহরা মতলা এলাকায় এক দুর্ঘটনায় শাহজাহান রনির মৃত্যু হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

এদিকে মৃত্যুর খবরে রনির পরিবার ও এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহতের মা নাছিমা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে নিখোঁজ হওয়ার আগেই বলেছিল তাকে মেরে ফেলা হবে। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।’

অভিযোগের বিষয়ে কুয়েতে অবস্থানরত মীর হোসেন মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি রনিকে চাকরি দিয়েছিলাম। গত ৪ ডিসেম্বর সে আমাকে কিছু না জানিয়ে চলে যায়। পরে তার মৃত্যুর খবর শুনি। আমি কখনো তাকে নির্যাতন করিনি। পরিবারের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। দূতাবাস থেকেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. নূরুল আমিন বলেন, ‘প্রবাসী কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব রনির মৃত্যু সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়ে পরিবারকে অবহিত করতে বলেন। পরিবারের যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত