‘জলবায়ু ঝুঁকি বীমা’ অপরিহার্য দুর্যোগ মোকাবিলায়

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৮ এএম

ক্রমবর্ধমান দুর্যোগের মুখে দেশে জলবায়ু ঝুঁকি বীমা (ক্লাইমেট রিস্ক ইন্স্যুরেন্স- সিআরআই) চালু ও সম্প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে বীমাভিত্তিক আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এক সেমিনারের বক্তারা।

গতকাল সোমবার রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ‘জলবায়ু ঝুঁকি বীমায় মিডিয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক একটি কর্মশালা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় অক্সফাম বাংলাদেশ, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) আয়োজিত এই ওয়ার্কশপটি ইআরএফ কার্যালয়ে হয়। কর্মশালায় অর্থনৈতিক ও পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিকের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং বীমা খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত কিনোট পেপারে বলা হয়, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগে প্রতিবছর দেশের প্রায় ১ শতাংশ জিডিপি ক্ষতি হয়েছে। অথচ এত বড় ঝুঁকির বিপরীতে দেশের বীমা কাভারেজ অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আওতা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ। ফলে কোটি কোটি মানুষ জলবায়ুজনিত ক্ষতির পর আর্থিক বিপর্যয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জলবায়ু ঝুঁকি বীমা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

অনুষ্ঠানে ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটির (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম বলেন, প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারাচ্ছে। তাই শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা এবং টেকসই বীমাব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরও বলেন, প্রচলিত বীমা অতীতের ক্ষতির ওপর নির্ভর করে কাজ করে, কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি ভবিষ্যৎমুখী। সে কারণে প্যারামেট্রিক বা আবহাওয়াভিত্তিক বীমা প্রয়োজন। তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি বীমাকে কার্যকর করতে হলে আইনি সংস্কার, শক্তিশালী ডেটাবেইস, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো দরকার।

কর্মশালায় কুড়িগ্রামে পরিচালিত একটি সফল সিআরআই পাইলট প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরা হয় অক্সফামের পক্ষ থেকে। ২০২৪ সালে ডব্লিউএফপি, অক্সফাম ও গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই প্রকল্পে ২০ হাজারের বেশি বন্যাকবলিত কৃষক মোবাইলের মাধ্যমে দ্রুত আর্থিক সহায়তা পান। ৪০ বছরের বেশি বন্যার তথ্যবিশ্লেষণ করে তৈরি করা এই ইনডেক্সভিত্তিক বীমা ব্যবস্থায় ক্ষয়ক্ষতি যাচাই ছাড়াই কয়েক দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ সম্ভব হয়েছে।

এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হুসনে আরা শিখা বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক খাতকেও অভিযোজিত হতে হবে। জলবায়ু বীমা দরিদ্র পরিবারগুলো দুর্যোগের পর ঋণের ফাঁদে পড়া থেকে রক্ষা করতে পারে। তিনি নারীদের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। সময়মতো সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তাদের জীবিকা রক্ষা সম্ভব, যা দেশের অর্থনীতির জন্যও বড় সম্ভাবনা তৈরি করবে।’

কর্মশালাটি সঞ্চালনা করেন অক্সফাম বাংলাদেশের ইনফ্লুয়েন্সিং, কমিউনিকেশন, অ্যাডভোকেসি ও মিডিয়াপ্রধান মো. শরীফুল ইসলাম। তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষতিপূরণ নয়, বরং আগাম সুরক্ষা, ন্যায্য অর্থায়ন ও সমাধানভিত্তিক রিপোর্টিংয়ে মনোযোগ দিতে হবে।

ডব্লিউএফপি বাংলাদেশের প্রোগ্রাম পলিসি অফিসার নরুল আমিন বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো অনিশ্চিত মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় থাকতে হবে, এটা কাম্য নয়। সিআরআই দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করে। আর এটি জানাতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালা বলেন, ‘আমরা অর্থনৈতিক সাংবাদিকরা জটিল আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে জননীতির সেতুবন্ধ তৈরি করি। জলবায়ু বীমাকে উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং জনগণের আর্থিক ন্যায্যতা হিসেবে তুলে ধরার সময় এসেছে।

অক্সফাম ইন বাংলাদেশের ক্লাইমেট জাস্টিস ও ন্যাচারাল রিসোর্স রাইটস প্রধান ড. মোহাম্মদ ইমরান হাসান বলেন, জলবায়ু সংকট তৈরিতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অবদান না থাকলেও কিন্তু তারাই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে। সিআরআই নিশ্চিত করতে হবে, যেন সবচেয়ে দরিদ্র মানুষ দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে উপকৃত হয়।

খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্লাইমেট রিস্ক ইন্স্যুরেন্স এখন আর বিকল্প নয় অপরিহার্য। জাতীয় নীতি, গণমাধ্যম এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগে বীমাব্যবস্থাকে সহজ, বিশ্বাসযোগ্য ও জনগণকেন্দ্রিক করতে পারলেই বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়নে আঞ্চলিক নেতৃত্বের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত