প্রথমবারের মতো লাখ কোটি রাজস্বের টার্গেট

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:৫৯ এএম

রাজস্ব আহরণে ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টার্গেট পেল চট্টগ্রাম কাস্টমস। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ কোটির বেশি টাকা রাজস্ব আদায়ের টার্গেট দিয়েছে। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস শেষে প্রতিষ্ঠানটি ৩১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করলেও বছর শেষে টার্গেট পূরণ নিয়ে সংশয়ে রয়েছে। অন্যদিকে গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) ৮০ হাজার ৪০২ কোটি টাকা আদায়ের টার্গেট থাকলেও আদায় হয়েছিল ৭৬ হাজার ১৪২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায়ের টার্গেট দেওয়ার কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম কাস্টমসের মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতি বছরই বিগত বছরের তুলনায় টার্গেট বাড়ানো হয়। সে হিসেবে এবার রাজস্ব আদায়ের টার্গেট এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এবার চট্টগ্রাম কাস্টমসে টার্গেট দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা।

এ টার্গেট কি আদৌ পূরণ করা সম্ভব? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতি বছরই আমরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম রাজস্ব আহরণ করে থাকি। তবে লক্ষ্যমাত্রা থাকলে একটি টার্গেট নিয়ে কাজ করা যায় এবং কাজের গতি আসে। আর এ বছর প্রথম পাঁচ মাসে ইতিমধ্যে আমরা ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছি, যার প্রবৃদ্ধি প্রায় ৯ শতাংশ। তাই এবার আমরা আশাবাদী যে টার্গেট পূরণ করতে পারব।

কীভাবে টার্গেট পূরণ করবেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সামনে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসছে। তখন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকবে এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগে আসবে। সে হিসেবে আমাদের ধারণা, টার্গেট অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব।

তবে কাস্টমসের এ টার্গেটকে অনেকটা অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন চিটাগং কাস্টমসের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এসএম সাইফুল আলম। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব বিষয় সমাধান না করে এমন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া সম্ভব কিন্তু বাস্তবায়ন করা কঠিন।

প্রতিবন্ধকতাগুলো কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে আদায় করা সম্ভব, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে কাস্টমসে অটোমেশন না থাকা, সার্ভার ডাউন, পণ্যের এক্সামিনে সমস্যা, পণ্য লোডিং ও আন লোডিংয়ে বন্দরের পক্ষ থেকে সৃষ্ট সমস্যা কিংবা দীর্ঘসূত্রতা, পণ্যের পরীক্ষণে কাস্টমসের পক্ষ থেকে হয়রানিসহ আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে হবে।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অনেকে বলছেন, আগামীতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে যদি তারা ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো সমাধান করে তাহলে রাজস্ব আদায় বাড়বে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির চাকাও ঘুরবে। উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টমস গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজস্ব আদায় করেছিল ২৯ হাজার ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এবার সেখানে আদায় হয়েছে ৩১ হাজার ৬০২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭৭ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার টার্গেট থাকলেও রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৬১ হাজার ৩৫০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৪ হাজার ৭৫ কোটি টাকার টার্গেট থাকলেও আদায় হয়েছিল ৫৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।

কিন্তু কোন ধরনের পণ্যে কাস্টমস বেশি রাজস্ব আদায় করে থাকে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে কাস্টমস থেকে প্রাপ্ত উপাত্তে দেখা যায়, হাইস্পিড ডিজেল, পাম অয়েল, ক্রুড অয়েল, আপেল, আঙুর, কমলা, চুনাপাথর প্রভৃতি আমদানি পণ্য থেকে বেশি রাজস্ব শুল্ক আহরিত হয়েছে। এদিকে রমজান সামনে রেখে যেমন তুলনামূলক ভোগ্যপণ্য আমদানি বেড়েছে, তেমনি জ¦ালানি তেল ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি হচ্ছে বেশি। জুলাই থেকে গত পাঁচ মাসে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ৪ কোটি ১০ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হিসাবে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, আসন্ন রমজান উপলক্ষে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে। এ ছাড়া সার্বিকভাবে বন্দর দিয়ে আমদানি পণ্যের পরিমাণও বেড়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহর বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় উপাত্তেও। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত বছর ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলেও এ বছর ইতিমধ্যে ৩৩ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ একক কনটেইনার (গত শনিবার পর্যন্ত) হ্যান্ডলিং হয়েছে এবং বছর শেষে তা ৩৪ লাখে পৌঁছাতে পারে।

দেশের ২১.২১ শতাংশ রাজস্ব আহরণ চট্টগ্রাম কাস্টমসের : চলতি অর্থবছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই-নভেম্বর সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব আদায় করেছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৬ টাকা। এ টাকার মধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টমস আদায় করেছে ৩১ হাজার ৬০২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, দেশের মোট রাজস্বের ২১ দশমিক ২১ শতাংশ আদায় করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস।

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিবাহিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। দেশের বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ পণ্য এ বন্দর দিয়ে পরিবাহিত হয়। এতে রাজস্ব আদায়ও এ বন্দর দিয়ে পরিবাহিত পণ্যের ওপর চট্টগ্রাম কাস্টমস আদায় করে থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত