সত্তরে পা

জন্মদিনেও নির্বিকার ইলিয়াস কাঞ্চন

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:৩৫ এএম

একজন সুপারস্টার হতে যেসব যোগ্যতা লাগে, তার সবই ছিল তার। সুপুরুষের মতো দৈহিক গঠন, সুশ্রী চেহারা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, মন হরণ করা হাসি, পরিমিত উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি সবই ছিল তার মধ্যে। বলা হচ্ছে দেশীয় চলচ্চিত্রের একসময়ের পর্দা কাঁপানো সুপারস্টার ইলিয়াস কাঞ্চনের কথা। পর্দায় যাকে দেখা গেছে রোমান্টিক, অ্যাকশন বয়, কমেডিয়ান এবং পরিবারের সুবোধ বালক হিসেবে। তার সব উপস্থিতিই লুফে নিয়েছে দর্শকরা। বিশেষ করে পারিবারিক টানাপড়েনে বিদ্ধ সংগ্রামী পুরুষ চরিত্রের ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিনয় আজও নন্দিত হয় পথে প্রান্তরে। এসব চরিত্রে কাজ করার দরুন অনেকে তাকে ‘বাংলার উত্তম কুমার’ বলেও মন্তব্য করতেন। আজ এই চিরসবুজ নায়ক পা রাখলেন জীবনের ৭০তম বছরে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাবেক এই সভাপতি প্রতিবছর জন্মদিনে আহামরি কোনো আয়োজন না করলেও চলচ্চিত্র পরিবার ও স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে আনন্দঘন পরিবেশেই দিনটি কাটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এবারের চিত্রটা একেবারে ভিন্ন। বিশেষ দিনে অনেকটাই নির্বিকার এই তারকা। পর্দার সেই শক্তিমান অভিনেতা দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় ধরে লড়াই করছেন বাস্তবের কঠিন কণ্টকের সঙ্গে। ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত ইলিয়াস কাঞ্চন এখন লন্ডনে চিকিৎসারত। সেখানে একমাত্র মেয়ে ইসরাত জাহানের বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। তার শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ তথ্য জানান নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচার) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ভাইস চেয়ারম্যান লিটন এরশাদ। তিনি জানান, ইলিয়াস কাঞ্চনের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। অসুস্থতার কারণে আগে কথায় যে জড়তা ছিল, তা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে।

চিকিৎসা নিয়ে লিটন এরশাদ বলেন, ‘ইতিমধ্যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারের বড় একটি অংশ অপসারণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট অংশ রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপির মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে ইলিয়াস কাঞ্চন মেডিসিন কোর্সে আছেন। এই কোর্স শেষ হলে আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করবেন চিকিৎসকরা।’

ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জের আশুতিয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হাজি আব্দুল আলী, মাতার নাম সরুফা খাতুন। ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯৭৫ সালে কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। কৈশোর থেকেই অভিনয়ের প্রতি দুর্বলতা ছিল ইলিয়াস কাঞ্চনের। তাই যুক্ত হয়েছিলেন বেশ কিছু নাট্য সংগঠনের সঙ্গে। নানা পথ পেরিয়ে অবশেষে কিংবদন্তি নির্মাতা সুভাষ দত্তের ‘বসুন্ধরা’ ছবি দিয়ে ১৯৭৭ সালে এ দেশীয় চলচ্চিত্রে ববিতার নায়ক হয়ে আবির্ভাব ঘটে ইলিয়াস কাঞ্চনের। বাকিটুকু শুধুই  ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে চলচ্চিত্রের কিংবদন্তির পথে নিয়ে গেছেন। এ পর্যন্ত অভিনয় করেছেন ৩০০’রও বেশি সিনেমায়। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল ব্যবসাসফল। আর ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া তার অভিনীত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র ব্যবসায়িক সাফল্য এখনো ঢাকাই ছবিতে রূপকথা হয়ে আছে।

তোজাম্মেল হক বকুলের পরিচালনায় এই ছবিতে কাঞ্চন জুটি বেঁধেছিলেন অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে। সীমাহীন কষ্টের এক অসাধারণ প্রেমের গল্প বেদের মেয়ে জোসনা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বাধিক ব্যবসাসফল ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হিসেবে

স্বীকৃত। ছবিটির সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও পুনর্নির্মাণ করে মুক্তি দেওয়া হয়। সেখানে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেন অঞ্জু ঘোষ এবং চিরঞ্জিত। এছাড়া ভেজাচোখ ছবিতে তার দুর্দান্ত অভিনয় কাঁদিয়েছিল প্রতিটি দর্শককেই। দীর্ঘদিনের অভিনয়জীবনে ইলিয়াস কাঞ্চন উপহার দিয়েছেন বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় জুটি। অঞ্জু ঘোষের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দিতি, চম্পাকেও তার সঙ্গে জুটি করে সফলতা পেয়েছেন নির্মাতারা। এছাড়াও অভিনয় করেছেন রোজিনা, কবিতা, সুচরিতা, সুনেত্রা, শিল্পী, মৌসুমী, পপিসহ অনেক নায়িকার বিপরীতে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নানা রকম সামাজিক আন্দোলনে রেখে চলেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য স্ত্রীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর থেকে ‘নিরাপদ সড়ক নিরাপদ জীবন’ সেøাগানে আন্দোলন। তার বদৌলতেই ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনটি বর্তমান বাংলাদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে এবং এর সঙ্গে বিভিন্ন মহল একাত্মতা ঘোষণা করেছে। তিনি বর্তমানে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রধান কাণ্ডারি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত