৬ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অনিয়ম

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৪০ এএম

গত ১৭ বছরে দেশে ছয়টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানম-িতে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।

‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরতে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির কর্মকর্তা নেওয়াজুল মওলা ও আশনা ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় নীতি-সংক্রান্ত অসংগতি ও দুর্নীতি দৃশ্যমান। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে প্রাধান্য না দেওয়া, জীবাশ্ম জ্বালানিতে অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা বজায় থাকলে ২০৫০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হয়ে যাবে।

২০০৮ সালে থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময় ওই গবেষণার আওতাভুক্ত ছিল। এতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশে অনেক বেশি ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ভারত-পাকিস্তানে ইউনিটপ্রতি ৩ সেন্ট, চীনে ৪ সেন্ট খরচ পড়ছে। সেখানে বাংলাদেশের গড় উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ১২ সেন্ট। আবার দেশের মধ্যেও সরকারি-বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনেক দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে টিআইবির প্রতিবেদনে।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন। তবে গবেষণার আওতাভুক্ত ছয়টি প্রকল্পে (সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে) প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১৩ কোটি ৮ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে; যা গড়ে দেড় গুণেরও বেশি। এই প্রকল্পগুলোতে প্রয়োজনের চেয়ে ২ হাজার ৯২৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে।

হিসাব কষে দেখা গেছে, ছয়টি প্রকল্পে ৪ হাজার ৪৩ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন হলেও ব্যয় করা হয়েছে ৬ হাজার ৯৭০ কোটি ৮ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে, প্রকল্প সরকারি জমিতে স্থাপিত হলেও (ভূমি অধিগ্রহণ ও ইজারার বিষয় না থাকা সত্ত্বেও), প্রতি মেগাওয়াট ইউনিট স্থাপনে ব্যয় ১৪ কোটি ৮ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে, যা দেশের অন্যান্য সৌর প্রকল্পের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয়বহুল। এর মধ্যে পাঁচটি প্রকল্পে শুধু ভূমি ক্রয় এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানে ২৪৯ কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকার দুর্নীতি হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ হলেও এর ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সুশাসনের ঘাটতি, নীতিগত দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর প্রণোদনা, শুল্ক ছাড়, ভ্যাট ছাড়, বীমায় প্রণোদনা যথেষ্ট কম বলে এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষকরা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগের ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩১টি আনসলিসিটেড নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ‘লেটার অব ইন্টেন্ট (এলওআই)’ বাতিল করেছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ইতিমধ্যেই ১৫টি প্রকল্পের জমি কেনা ও কর প্রদানসহ অফেরতযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে। চারটি প্রকল্পে বিদেশি কোম্পানির সরাসরি বিনিয়োগ আছে, যার দুটিতে শতভাগ মালিকানা বিদেশি কোম্পানির হাতে রয়েছে। তাই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৫৫টি প্যাকেজে। ২২টি প্যাকেজে শুধু একটি করে দরপত্র পাওয়া গেছে। ১৩টি প্যাকেজে কোনো দরপত্র পাওয়া যায়নি।

টিআইবি বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘গ্রিন ফাইন্যান্সিং’-এর আওতায় নবায়নযোগ্য খাতের জন্য আলাদা একটি স্কিম থাকলেও দীর্ঘ ও জটিল আবেদন প্রক্রিয়ার কারণে ব্যস্তবিক ব্যবহার খুবই সীমিত।

গবেষণায় বলা হয়, দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবকাঠামো (বিস্তৃত এলাকা) ব্যবহার করে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সুযোগ থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিনিয়োগের ঘাটতি থাকায় তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

টিআইবি বলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৯৮০ মিলিয়ন ডলার (১১ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা) প্রয়োজন হবে। ২০৩০ সালের পর থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সর্বোচ্চ ১.৪৬ বিলিয়ন ডলার (১৭ হাজার ২৮০ কোটি টাকা) প্রয়োজন হবে। কিন্তু অর্থায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা নেই সরকারের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত