ঘোড়ার গাড়ি থেকে অ্যালগরিদম

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:১৩ এএম

প্রাচীন রোমের পাথুরে রাস্তায় রথের জট থেকে শুরু করে আজকের মেগাসিটির ডিজিটাল সিগন্যাল ট্রাফিক জ্যাম আসলে সভ্যতার এক অনিবার্য ছায়া, যা গতির সমান্তরালে আমাদের থামিয়ে দিতে চায়। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

চাকা আবিষ্কারের সেই আদিম মুহূর্ত থেকেই যেন মানুষের গতির নেশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জন্ম নিয়েছে এক স্থবিরতার নাম ট্রাফিক জ্যাম। আমরা অনেকেই মনে করি ট্রাফিক জ্যাম হয়তো আধুনিক যুগের অভিশাপ, কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এটি আসলে সভ্যতার এক অনিবার্য সহচর। প্রাচীন রোমের পাথুরে রাস্তা থেকে শুরু করে আজকের মেগাসিটির ডিজিটাল সিগন্যাল পর্যন্ত, ট্রাফিক জ্যামের গল্পটা আসলে মানুষের এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টার বিপরীতে থমকে যাওয়ার গল্প। আজ যখন আমরা সেলফ-ড্রাইভিং কার বা স্বয়ংক্রিয় গাড়ির স্বপ্নে বিভোর, তখন পেছনে ফিরে তাকানো জরুরি যে আমরা আসলে এই জট থেকে মুক্তি পেতে চাই নাকি কেবল জটে বসে থাকার আরাম খুঁজছি।

প্রাচীন রোম ও রথের জটাজাল

ইতিহাসের প্রথম ট্রাফিক জ্যামের হদিস পেতে আমাদের ফিরতে হবে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যে। জুলিয়াস সিজারের সময় রোম শহর এতটাই জনাকীর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, দিনের বেলা সেখানে মালবাহী রথ বা চাকাওয়ালা বাহন চলাচল নিষিদ্ধ করতে হয়েছিল। অবাক করা তথ্য হলো, বিশ্বের প্রথম ট্রাফিক আইন বা ম্যানেজমেন্টের শুরুটা হয়েছিল সেখানেই। দিনের বেলা রথ চললে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলা অসম্ভব হয়ে পড়ত, তাই রোমানরা নিয়ম করেছিল যে সূর্যাস্তের পর এবং ভোরের আগে সব মালবাহী বাহন শহরে ঢুকবে। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো রাতের রোম হয়ে উঠল এক নরক। পাথুরে রাস্তায় চাকার ঘর্ঘর শব্দে মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যেত। সেই যুগেও মানুষ জ্যাম নিয়ে বিরক্ত ছিল, তবে সেটি ছিল সময়ের ভাগাভাগি নিয়ে। মধ্যযুগের ইউরোপেও একই দৃশ্য দেখা যায়। সরু গলি আর কর্দমাক্ত রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি আর পথচারীদের যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো, তা প্রমাণ করে যে জ্যাম মানে কেবল গাড়ির জট নয়, এটি আসলে সীমিত স্থানে অধিক মানুষের পণ্য ও ক্ষমতার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।

শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক বিশৃঙ্খলা

আসল পরিবর্তনটা এলো আঠারো ও উনিশ শতকে শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে। মানুষ দলে দলে গ্রাম ছেড়ে শহরের কারখানায় কাজ করতে আসতে শুরু করল। শহরগুলো বড় হতে থাকল কিন্তু রাস্তাগুলো রয়ে গেল সেই মান্ধাতা আমলের। প্রথম গণপরিবহন হিসেবে ট্রাম আর ঘোড়ায় টানা বাসের প্রচলন হলো ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্ট অফিস টাইম বা কর্মঘণ্টা শুরু হওয়ায় এক অদ্ভুত সংকট তৈরি হলো। আগে মানুষ সারা দিন ধরে রাস্তায় যাতায়াত করত, এখন সবাই ঠিক সকাল ৯টায় অফিসে যেতে চায় আর বিকেল ৫টায় ফিরতে চায়। এই যে ‘রাশ আওয়ার’ বা ব্যস্ত সময়ের ধারণা, এটিই ট্রাফিক জ্যামকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিল। শহর পরিকল্পনাবিদরা মানুষের এই বিপুল গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খেলেন। রাস্তা চওড়া করা হলেও দেখা গেল মানুষের সংখ্যা তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ, আমরা শহর বানালাম কাজের জন্য, কিন্তু সেই শহরে কাজের জায়গায় পৌঁছানোটাই হয়ে উঠল সবচেয়ে কঠিন কাজ।

স্বাধীনতার প্রতীক গলার কাঁটা

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে হেনরি ফোর্ড যখন টি-মডেল গাড়ি বাজারে আনলেন এবং ম্যাস প্রোডাকশন বা গণউৎপাদন শুরু হলো, তখন মানুষের কাছে গাড়ি ছিল ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক। যে কেউ চাইলেই নিজের গাড়িতে করে যেখানে খুশি যেতে পারে এই স্বপ্ন মধ্যবিত্তের নাগালে চলে এলো। কিন্তু এই স্বাধীনতাই কাল হয়ে দাঁড়াল। যখন লাখ লাখ মানুষ একই সময়ে একই স্বাধীনতার স্বাদ নিতে রাস্তায় নামল, তখন সেই স্বাধীনতা স্থবিরতায় রূপ নিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শহরতলিতে বা সাবার্ব এলাকায় থাকার সংস্কৃতি গড়ে উঠল। মানুষ শান্তিতে থাকার জন্য শহরের বাইরে ঘর বাঁধল আর কাজের জন্য প্রতিদিন নিজের গাড়ি নিয়ে শহরের কেন্দ্রে আসতে শুরু করল। আধুনিক ট্রাফিক জ্যামের যে রূপ আমরা আজ দেখি মাইলকে মাইল গাড়ির সারি আর ইঞ্জিনের গোঙানি তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল তখনই। গাড়ি আর বিলাসিতা রইল না, বরং তা হয়ে উঠল সময়ের অপচয়কারী এক যন্ত্র।

শুধু সময় নয়

ট্রাফিক জ্যামকে আমরা কেবল বিরক্তির কারণ হিসেবে দেখি, কিন্তু এর প্রভাব আরও অনেক গভীর। অর্থনৈতিকভাবে একটি দেশের বিশাল অঙ্কের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় রাস্তার এই স্থবিরতায়। ঢাকা, মুম্বাই বা মেক্সিকো সিটির মতো শহরগুলোতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা স্রেফ রাস্তায় বসে নষ্ট হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় জ্বালানি অপচয় এবং ভয়াবহ বায়ুদূষণ। স্থির দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ইঞ্জিন যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে, তা পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। কিন্তু এর চেয়েও বড় ক্ষত তৈরি হয় মানুষের মনে। ‘রোড রেজ’ বা রাস্তায় চলার সময় যে উগ্র মেজাজ তৈরি হয়, তা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। দীর্ঘক্ষণ জ্যামে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ, উচ্চ রক্তচাপ এবং বিষণœতা বাসা বাঁধে। জ্যামে বসে থাকা মানে কেবল সময়ের অপচয় নয়, এটি আসলে মানুষের জীবনের সৃজনশীল মুহূর্তগুলোকেও কেড়ে নেওয়া।

আমরা দীর্ঘকাল ধরে ট্রাফিক জ্যাম কমানোর জন্য ভুল দাওয়াই ব্যবহার করে এসেছি। যখনই জ্যাম বেড়েছে, আমরা রাস্তা চওড়া করেছি কিংবা বড় বড় ফ্লাইওভার বানিয়েছি। কিন্তু একে বলা হয় ‘ইনডিউসড ডিমান্ড’ বা প্ররোচিত চাহিদা। অর্থাৎ, আপনি যত বেশি রাস্তা বানাবেন, মানুষ তত বেশি উৎসাহিত হবে ব্যক্তিগত গাড়ি নামাতে। ফলে নতুন রাস্তা কিছুদিনের মধ্যেই আবার জ্যামে ভরে ওঠে। ফ্লাইওভার আসলে জ্যাম সমাধান করে না, এটি কেবল জ্যামের জায়গাকে এক মোড় থেকে অন্য মোড়ে সরিয়ে দেয়। ট্রাফিক পুলিশ বা ইলেকট্রনিক সিগন্যাল দিয়ে আমরা মূলত উপসর্গ কমানোর চেষ্টা করেছি, রোগের মূল কারণ নয়। অথচ উন্নত বিশ্ব দেখিয়েছে যে ট্রাফিক জ্যামের প্রকৃত সমাধান হচ্ছে শক্তিশালী গণপরিবহন ব্যবস্থা। মেট্রোরেল বা আলাদা বাস লেন যতটা কার্যকর, দশটি নতুন ফ্লাইওভারও ততটা নয়। তবুও মানুষ তার ব্যক্তিগত গাড়ির বিলাসিতা ছাড়তে চায় না বলেই সমস্যাটি আজও রয়ে গেছে।

অ্যালগরিদমের গোলকধাঁধা

প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হাতে এলো জিপিএস এবং গুগল ম্যাপসের মতো সুবিধা। আমরা ভাবলাম এখন অন্তত জ্যাম এড়ানো যাবে। রিয়েল-টাইম ট্রাফিক ডেটা আমাদের বলছে কোন পথে গেলে দ্রুত পৌঁছানো যাবে। কিন্তু এখানেও এক অদ্ভুত টুইস্ট আছে। যখন গুগল ম্যাপস শহরের হাজার হাজার মানুষকে একটি অপেক্ষাকৃত ফাঁকা রাস্তা দেখায়, তখন সবাই একসঙ্গে সেই সরু রাস্তায় ঢুকে পড়ে। ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, সেই ফাঁকা রাস্তাটিও মুহূর্তের মধ্যে স্থবির হয়ে পড়েছে। অ্যালগরিদম আমাদের গতি দিতে চাইলেও যখন সবাই একই বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে, তখন সেটিও একটি নতুন ধরনের জ্যাম তৈরি করে। আমরা এখন ডিজিটাল গোলকধাঁধায় আটকে আছি, যেখানে প্রযুক্তি আমাদের পথ দেখাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই পথও গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

সেলফ-ড্রাইভিং কার

বর্তমানে ট্রাফিক জ্যামের সবচেয়ে আধুনিক এবং আলোচিত সমাধান হলো সেলফ-ড্রাইভিং কার বা স্বয়ংক্রিয় গাড়ি। গবেষকরা বলছেন, ট্রাফিক জ্যামের মূল কারণ গাড়ি নয়, বরং মানুষ। মানুষের মধ্যে ইগো আছে, মানুষ হুট করে ব্রেক চাপে, লেন পরিবর্তন করে এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। একটি গাড়ি যখন ব্রেক চাপে, তখন তার পেছনের গাড়িগুলোকে আরও জোরে ব্রেক চাপতে হয়, যা রাস্তার অনেক পেছনে একটি কৃত্রিম জট তৈরি করে একে বলা হয় ‘ফ্যান্টম ট্রাফিক জ্যাম’। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় গাড়িগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কথা বলবে, তখন তারা একই গতিতে চলবে এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখবে। সেখানে কোনো প্যানিক ব্রেকিং থাকবে না, কোনো ইগো ড্রাইভিং থাকবে না। গাড়িগুলো যখন একটি সেন্ট্রাল সিস্টেম বা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে, তখন ট্রাফিক লাইটেরও প্রয়োজন হবে না। তারা গাণিতিক নিখুঁততায় একে অপরকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। এই স্বপ্নটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

সেলফ-ড্রাইভিং কারের এই স্বপ্ন কি আসলেই বাস্তবসম্মত? বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই অবকাঠামো তৈরি করা কি সম্ভব? একটি সেলফ-ড্রাইভিং কারকে চলতে হলে রাস্তার মার্কিং এবং সিগন্যাল অত্যন্ত উন্নত হতে হয়। তাছাড়া নৈতিক একটি প্রশ্নও থেকে যায় দুর্ঘটনার মুহূর্তে গাড়িটি কাকে বাঁচাবে? গাড়ির ভেতরে থাকা যাত্রীকে নাকি রাস্তার পথচারীকে? সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো, যদি যাত্রা অনেক বেশি আরামদায়ক হয়ে যায় এবং সেলফ-ড্রাইভিং কার মানুষের যাতায়াত খরচ কমিয়ে দেয়, তবে মানুষ আরও বেশি করে গাড়ি ব্যবহার শুরু করবে। এর ফলে রাস্তা হয়তো জ্যামমুক্ত হবে না, বরং আমরা আরও বেশি সময় গাড়ির ভেতর কাটাতে শুরু করব। যদি জ্যামেও বসে থাকতে আরাম লাগে, তবে কি আমরা আসলে জ্যাম কমানোর চেষ্টা করব? রাজনীতি আর অর্থনীতির মারপ্যাঁচে সেলফ-ড্রাইভিং কার কি কেবল ধনীদের বিলাসিতা হয়ে থাকবে, নাকি সাধারণের মুক্তি আনবে সেই উত্তর সময়ই দেবে।

ভবিষ্যতের শহরগুলো কেমন হওয়া উচিত? কেবল কি প্রযুক্তিনির্ভর নাকি মানুষের বাসযোগ্য? অনেক নগর পরিকল্পনাবিদ এখন ‘কার-ফ্রি সিটি’ বা গাড়িমুক্ত শহরের কথা বলছেন। যেখানে মানুষ হাঁটবে, সাইকেল চালাবে এবং উন্নত গণপরিবহন ব্যবহার করবে।

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টে হয়তো বড় ভূমিকা রাখবে, কিন্তু মূল সমাধান লুকিয়ে আছে মানুষের অভ্যাসের পরিবর্তনে। আমরা যদি ব্যক্তিগত গাড়ির মোহ ত্যাগ করে পাবলিক ট্রান্সপোর্টকে প্রাধান্য দিতে পারি, তবেই জ্যামের এই আদিম অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ট্রাফিক জ্যামের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে আমরা যতই গতি বাড়াতে চেয়েছি, ততই জটে আটকে গেছি।

তাই আগামী দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শহর গড়া যেখানে আমাদের গতির জন্য প্রযুক্তির মুখাপেক্ষী হতে হবে না, বরং শহরটাই হবে আমাদের জন্য স্বচ্ছন্দ। আমরা কি জ্যাম কমাতে চাই, নাকি শুধু একটি এসি রুমে সোফায় বসে জ্যাম পার করতে চাই এই সিদ্ধান্তটিই আমাদের ভবিষ্যতের শহরের রূপরেখা ঠিক করে দেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত