স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। কারণ স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তির পকেট ব্যয় অনেক বেশি, বিশেষ করে ওষুধ কিনতে গিয়ে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (ইউএইচসি) অর্জনের মাইলফলক বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন। টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হলে ওষুধে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য বীমা বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘ইউওয়াইপি:অপরাজেয় তারুণ্য’ আয়োজিত জাতীয় যুব কনফারেন্সের সমাপনই অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তাঁরা। গুটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ ইকোনমিক্স বিভাগের শিক্ষক এ. এম জাহাঙ্গীর খান বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে ৮৬ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ দারিদ্র্যসীমা নিচে নেমে যাচ্ছে, যেখানে ২০২২ সালের বিআইডিএসর সমীক্ষা অনুযায়ী প্রায় ৬১ থেকে ৮৬ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৩.৭%) এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। কারণ স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তির পকেট ব্যয় (আউট-অফ-পকেট) অনেক বেশি, বিশেষত ওষুধ কিনতে গিয়ে; যা দেশের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে আরও গভীর দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্য বীমার অভাব, অপর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ এই প্রধান কারণ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হেলথ ইকোনমিক্স ইউনিটের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. সাব্বির হয়দার বলেন, ব্যয়বহুল চিকিৎসায় আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা ‘স্বাস্থ্য-কবচ’ চালু করতে হবে। প্রাথমিকভাবে সকল সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও তাদের পরিবারকে ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘স্বাস্থ্য-কবচ’-এ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন তৈরি করা। সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমার জন্য একটি স্বাস্থ্য বীমা কর্তৃপক্ষ গঠন করা ।
স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ডা. আহমদ এহসানুর রাহমান বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যয়ের ঝুঁকি কমাতে সরকারের কিছু করণীয় রয়েছে। স্বাস্থ্যকে একটি পাবলিক গুডস ও মেরিট গুড হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। কর আদায় সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। সর্বোচ্চ আয় শ্রেণি থেকে আদায়কৃত করের অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের জন্য নির্ধারিত করতে হবে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ভোগ্যপণ্যের ওপর আবগারি কর আরোপ/বৃদ্ধি করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল পণ্য ও সেবার উপর পৃথক স্বাস্থ্য কর চালু করতে হবে। জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা তহবিল গঠন করে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সিএসআর বাজেটের নির্দিষ্ট অংশ বাধ্যতামূলকভাবে এই তহবিলে জমা করতে হবে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে জনগণের ব্যয় কমিয়ে আনতে এর রকম ৩২টি সুপারিশ আমরা সংস্কার কমিশন থেকে প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু ঐক্যমত্য কমিশনে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোন উদ্যোগ দেখতে পায়নি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহকারী উপদেষ্টা ডা. মো. সায়েদুর রহমান, দেশে স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রের ব্যয় খুব কম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু গণমাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ানো বিষয়ে মতামত তৈরি করতে হবে। স্বাস্থ্যকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা বাস্তবায়নে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ বিষয় যেন অন্তর্ভুক্ত করে এই বিষয়ে সচেতন তরুণ ও নাগরিক সমাজকে স্বোচ্চার হতে হবে।
তিনদিন ব্যাপী এই কনফারেন্সে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্ট ও ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজের ফোকাল পয়েন্ট ডা. সুব্রত পাল বলেন, সুইডেন দূতাবাসের ডেভেলপমেন্ট করর্পোরেশন সেকশনের উপদেষ্টা ডা. মো. জহিরুল ইসলাম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডা. সাজ্জাদ রোকন ফিরোজ প্রমুখ।
