আটক আসামিকে ছাড়িয়ে নিতে থানার ভেতর ওসির সঙ্গে বাগ্বিত-ায় জড়িয়ে ‘থানা পুড়িয়েছি’ উল্লেখ করে হুমকি দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হবিগঞ্জ জেলার সদস্য সচিব মাহদী হাসানকে আটক করেছে জেলা ডিবি পুলিশ। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় তাকে শহরের শায়েস্তানগর এলাকার একটি বাসা থেকে আটক করে হবিগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার ইয়াসমিন আক্তার আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে মাহাদী হাসানকে আটকের পর থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা থানার সামনে জমায়েত হয়ে তার মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন। অন্যদিকে ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ায় গতকাল মাহাদীকে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, শায়েস্তাগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি এনামুল হাসান নয়নকে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আটক করে শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কর্মকান্ড পরিচালনা করছেন। নয়নকে আটকের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জেলা শাখার নেতাকর্মীরা তার মুক্তির দাবিতে গত শুক্রবার দুপুরে থানা ঘেরাও করেন। এ সময় জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র অধিকার আন্দোলনের সদস্য সচিব মাহদী হাসানের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী ওসির কক্ষে অবস্থান নেন। তারা দাবি করেন, নয়ন একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও পরে তিনি জুলাই আন্দোলনে জড়িত হন। তারা নয়নকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি করেন। একপর্যায়ে আটক ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে নিতে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ওসির সঙ্গে তর্কে জড়ান মাহদী হাসান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায় মাহদী হাসান ওসিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে আপনি (ওসি) কোন সাহসে বললেন ‘আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে।’ আমরা এতগুলো ছেলে ভাইসা আসছে নাকি, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা সরকার গঠন করেছি। এই জায়গায় আপনারা আমাদের প্রশাসনের লোক। আপনারা আমাদের ছেলেদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছেন।” পরে খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলাম শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ছুটে যান। তার মধ্যস্থতায় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নয়নকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাহদী হাসান বলেন, আটক হওয়া ছাত্রনেতা একসময় ছাত্রলীগ করলেও তিনি জুলাই আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। শুধু তার অতীত রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে আসে। শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ আগেও আমাদের তিন নেতাকর্মীকে আটক করেছিল। বানিয়াচং থানা জ্বালিয়ে দেওয়া ও পুলিশকে পুড়িয়ে ফেলার বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি স্লিপ অব টাং। এ ঘটনায় কেন্দ্র থেকে কারণ দর্শনোর নোটিস পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন স্বাক্ষরিত মাহাদীকে শোকজের চিঠিতে বলা হয়, ‘শুক্রবারে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ থানায় আপনার প্রদত্ত কিছু অনাকাক্সিক্ষত বক্তব্য গণমাধ্যম সূত্রে আমরা লক্ষ করেছি, যা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আদর্শের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং একই সঙ্গে যা জনপরিসরে সংগঠনের ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন করেছে। আপনি কেন এ ধরনের বক্তব্য প্রদান করেছেন, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং আপনার বিরুদ্ধে কেন স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে আপনার লিখিত জবাব আগামী ২৪ (চব্বিশ) ঘণ্টার মধ্যে দপ্তরের মাধ্যমে সভাপতি রিফাত রশিদ বরাবর উপস্থাপন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। পাশাপাশি, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত আপনাকে সংগঠনের সকল প্রকার সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো।’
শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম বলেন, এখানে আমাদের কোনো অপরাধ ছিল না। আটকের পর যা হয়েছে, তা দেশবাসী দেখেছেন। সবার হাতে হাতে সে ভিডিও প্রচার হয়েছে। তারাই ভিডিও করেছে, আবার তারাই ছেড়েছে। এর সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কেউ অপরাধ করে থাকলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে (নয়ন) বৈষম্যবিরোধী একটি মামলায় সন্দেহভাজন ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে আটক করি। ওইদিন রাত বেশি হওয়ায় আমরা যাচাই-বাছাই করতে পারিনি। পরদিন নানাভাবে তথ্য নিয়ে আমরা জানতে পেরেছি, আটক হওয়া ব্যক্তি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়। পরে তাকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
