কাঁচা পাট রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ চান ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০৪ এএম

বিদায়ী মৌসুমে দেশে পাটের উৎপাদন কম হয়েছে। যে কারণে বেড়েছে দাম এবং কাঁচামাল সংকটে ভুগছে পাটকলগুলো। এ অবস্থায় কাঁচা পাটের রপ্তানি আদেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন। গত ১ জানুয়ারি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে রপ্তানি বন্ধের দাবি জানিয়ে একটি আবেদনও দিয়েছে সংগঠনটি। এ ধারাবাহিকতায় গতকাল রবিবার অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রতিনিধিদল বাণিজ্য বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ সময় পাট রপ্তানি বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা।

বৈঠকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব বিলকিস জাহান রিমি, বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাপস প্রামাণিক, ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন, বোর্ড ডিরেক্টর মোহাম্মদ শাহজাহান এবং হেলাল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় কাঁচা পাটের উৎপাদন কম হয়েছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বর শর্ত সাপেক্ষে কাঁচা পাট রপ্তানি চালু রেখে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ফলে কাঁচা পাটের সরবরাহ সাময়িকভাবে কিছুটা স্বাভাবিক পর্যায়ে আসলেও এখনো আবার কাঁচা পাটের মূল্য মণপ্রতি ৪ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার টাকায় ওঠানামা করছে।

বর্তমানে পাটের এই উচ্চমূল্য ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে পাটকলগুলো চাহিদা অনুযায়ী কাঁচা পাট সংগ্রহ করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে অল্প সময়ের মধ্যে অধিকাংশ মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। যা দেশের পাটশিল্পের জন্য এটি একটি অশনিসংকেত। এ প্রেক্ষাপটে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাঁচা পাটের রপ্তানি আদেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

অ্যাসোসিয়েশন চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক জানান, দাম বাড়ার কারণ ও রপ্তানি সুযোগ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী পাটের অবৈধ মজুদ করেছে। ফলে প্রতিনিয়ত পাটের দাম বেড়েই চলেছে। এতে কৃষক উপকৃত হচ্ছে না বরং মজুতদারেরা লাভবান হচ্ছে। তারা পাটের বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।

তিনি বলেন, পাট রপ্তানি বন্ধ এবং অবৈধ মজুদদারি রোধ না করলে প্রকৃত পাটচাষী ও পাট ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি দাবি করেন, পাট মজুদে প্রচুর কালো টাকা ব্যয় করা হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, উৎপাদিত পাট পণ্যের লাগাম ছাড়া মূল্য বৃদ্ধি কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে স্থানীয় পাটশিল্প। এতে বিদেশি ক্রেতারা আগের মতো আবারও বিকল্প পণ্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে এ পরিস্থিতিতে। ভবিষ্যতে এই সব বাজার পুনরুদ্ধার করা অনেক কষ্টসাধ্য হবে।

এদিকে গতকালের সভায় বাণিজ্য এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ব্যবসায়ীদের বলেন, পাটের অবৈধ মজুদদারি প্রতিরোধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে। খুব শীঘ্রই পাট উৎপাদন বেশি হয় এমন চার জেলায় মজুদদারি প্রতিরোধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া রপ্তানি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার আবেদনের বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে।

বৈঠকে ব্যবসায়ীরা পাটবীজ সংকটের কথাও উপদেষ্টাকে জানালে তিনি বলেন, মানসম্মত পাটবীজের সংকট দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে বীজের সংকট হবে না।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ কাঁচা পাট রপ্তানি সীমিত করার কারণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পাটকলগুলো বা চটকলগুলো তীব্র সংকটে পড়েছে। শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দু বিজনেস লাইনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কাঁচা পাটের দাম প্রতি টন ১ লাখ ১০ হাজার রুপি ছাড়িয়ে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের মিলগুলোর একাংশ উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়ার আশায় ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা পাট মজুদ করছেন। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের প্রধান পাট উৎপাদনকারী ও পাটশিল্প কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

এই অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর ভারতের বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গিরিরাজ সিংকে দেওয়া এক চিঠিতে ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (আইজেএমএ) চেয়ারম্যান রাঘবেন্দ্র গুপ্ত বলেছেন, বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপে হঠাৎ করেই কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এতে মিলগুলো বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একইসঙ্গে স্থানীয় বাজারে কাঁচা পাটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। রাঘবেন্দ্র গুপ্ত বলেন, এই সম্মিলিত প্রভাব মিলের কার্যক্রম, কর্মসংস্থান এবং পাটপণ্যের মূল্যশৃঙ্খলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

দ্য হিন্দু বিজনেস লাইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইজেএমএ তাদের চিঠিতে ভারতের পক্ষ থেকে উচ্চ ফলনশীল পাটের বীজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করেছে। সংগঠনটি বলছে, বাংলাদেশ উচ্চ ফলনশীল পাট বীজের জন্য ভারতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই কাঁচা পাট রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব হিসেবে ভারত থেকে বীজ রপ্তানি বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছে তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত