বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাম দলগুলোর জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নেতারা। গতকাল সোমবার সকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক অবস্থা, উগ্রবাদের উত্থান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও আগামীর সংসদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আগে ফ্রন্টের নেতারা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য খোলা শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন।
বৈঠকের পর বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তার সন্তান হিসেবে এবং পরিবারবর্গকে সমবেদনা জানাতে আমরা এসেছি। উনি (তারেক রহমান) দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। আসার পর তার মাতৃবিয়োগে শোকাহত পরিবার ও দল আমরা সহমর্মিতা ও সমবেদনা জানাতে এসেছিলাম। এর বাইরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আসন্ন নির্বাচন ইত্যাদি বিষয়ে। এখানে যে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্ফালন; এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বজলুর রশীদ জানান, তারেক রহমান তাদের বলছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হলো আমাদের ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকে না, আর নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের যে আকাক্সক্ষা, সেগুলোকে ধরেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে। এখানে বিশ্বাসী থাকবে, অবিশ্বাসী থাকবে, সংশয়বাদী থাকবে সবাইকে নিয়েই আমাদের চলতে হবে। একটা উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পরিকল্পনা আমাদের (বিএনপি) আছে। আমরা সেভাবেই কাজ করতে চাই এবং অতীত থেকে শিক্ষা নিতে চাই। জনগণই আমাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। মানুষের যাতে সুবিধা হয়, সুযোগ-সুবিধাগুলো উপভোগ করতে পারে সেটা শুধু পরিকল্পনা নয়, সেটা বাস্তবায়নের দিকেও যেতে চাই।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরও বলেছেন, আমাদের বিরোধী দল থাকবে অপজিশন থাকবে। আপনাদের সঙ্গে হয়তো অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য আছে, থাকবে। কিন্তু আবার দেশের প্রশ্নে জনগণের প্রশ্নে সেগুলো আমরা নিশ্চয়ই বিনিময় করব। মাঝে মাঝে আপনাদের পরামর্শ থাকলে দেবেন। একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে উঠুক। আমরা বলছি, একটা পলিটিক্যাল কালচার এখানে গড়ে তোলা দরকার। রাজনৈতিক সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা, ফিলোসফিকাল টলারেন্স, যেটা গণতন্ত্রের একটা পূর্বশর্ত।
বজলুর রশীদ বলেন, আমরা বলেছি, একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তি স্বাধীনতাবিরোধীরা এসে বলল যে জাতীয় সরকারে থাকবে...। উনি (তারেক রহমান) বললেন, বাইরে তারা এটা বলছে। আমাদের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলেনি। শুধু বলছে যে, দেশের প্রশ্নে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমরা বলছি পথের ভিন্নতা থাকলেও স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার।
বৈঠকে সিপিবির সভাপতিম-লীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, স্থায়ী কমিটির সদস্য মোস্তাক হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, সম্পাদকম-লীর সদস্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার ও বাসদ (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টার পাঠানো শোকবার্তা গ্রহণ : প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকবার্তা পাঠানো হয়েছে। শোকবার্তাটি গ্রহণ করেন তারেক রহমান। সোমবার বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এ শোকবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের একান্ত সচিব-২ এসএম খাইরুল ইসলাম (সজীব) প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে শোকবার্তাটি কার্যালয়ে পৌঁছে দেন।
গণসংহতি আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক : গতকাল দুপুরে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী গণসংহতি আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারেক রহমান। বৈঠক শেষে সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, তারেক রহমান তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা আমাদের জানিয়েছেন। আমরাও আমাদের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছি। তিনি বলেছেন, ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় এ দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের আকাক্সক্ষাকে সামনে রেখে দেশ পরিচালনা করতে হবে। দেশে যাতে ফ্যাসিবাদ ও নির্বাচনহীনতার সংস্কৃতি পুনরায় প্রতিষ্ঠা না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই এবং সংস্কার বাস্তবায়নের জন্যও নির্বাচন অপরিহার্য।
বৈঠকে সাকি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল, রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আক্তার প্রমুখ।
তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাবির ভিসির সাক্ষাৎ : রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে খোলা শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। পরে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। সাক্ষাৎ শেষে ঢাবি ভিসি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্থিতিশীলতা এবং পরিস্থিতি নিয়ে আমরা প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করছি এবং পরামর্শ করছি। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আজকে (গতকাল) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমার প্রাথমিক আলাপ হয়েছে। আলাপে আমরা তাকে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি বিষয়ে অবহিত করেছি।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থিতিশীলতা, সংহতি এবং শৃঙ্খলার ওপর জাতীয় নির্বাচনের অনেক প্রভাব এবং ইম্প্রেশন আছে। আমরা তার (তারেক রহমান) সহযোগিতা চেয়েছি এবং তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। একই ধারাবাহিকতা আমরা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রধানদের সঙ্গেও কথা বলব।’
নিয়াজ আহমদ খান আরও বলেন, ‘আমরা গত দেড় বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু বড় মাপের সংস্কার করেছি। বড় কিছু ইনফ্রাস্ট্রাকচারের কাজ হয়েছে। এগুলো সম্পর্কে তাকে (তারেক রহমান) আমরা ব্রিফ করেছি। আমরা চাই যে, সমাজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হোক। তিনি কিছু সুপরামর্শ দিয়েছেন আমাদের। আমরা সেগুলো বিবেচনা করছি।’
