গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের ব্যাধি

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:২৪ এএম

মানবদেহের গলার নিচের দিকে শ্বাসনালির সামনে থাকা প্রজাপতি আকারের ছোট গ্রন্থিটিই হচ্ছে থাইরয়েড গ্রন্থি। থাইরয়েড হরমোনটা কিন্তু থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি করে না, মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে আসা থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন বা ঞঝঐ, নিয়ন্ত্রণ করে

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে আসা T₃ Ges T4  হরমোনকে। শরীরের বিপাকীয় হার, পেশির নিয়ন্ত্রণ, মস্তিষ্কের বৃদ্ধি, হাড়ের রক্ষণাবেক্ষণ, হৃদযন্ত্র এবং হজমের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে এই হরমোন। এ কারণে গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখা আবশ্যক, যা মা এবং ভ্রুণের স্বাস্থ্যর ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

প্রাথমিক কারণ : অটোইমিউন ডিসঅর্ডার, আয়োডিন ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন।  

ঝুঁকিপূর্ণ যেসব মা : লক্ষণ থাকুক বা না

থাকুক, প্রসব পূর্ববর্তী চেক আপ (ANC)-এ থাইরয়েড screening করাতে হবে। বয়স্ক গর্ভাবস্থা, পূর্বের গর্ভপাত্র (>২-৩টি), টাইপ (১) ডায়াবেটিস, পারিবারিক ইতিহাস, বন্ধ্যত্ব ইতিহাস, পূর্বের থাইরয়েডের সমস্যা, অন্যান্য গর্ভাবস্থার জটিলতা।

গর্ভস্থ শিশুর ওপর প্রভাব : গর্ভপাত, অপরিপক্ব জন্ম, কম ওজনের শিশু জন্ম, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা মেধা বিকাশ কম হওয়া, হৃদযন্ত্রের জটিলতা।

জন্মগত ত্রুটি, জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম, গর্ভাবস্থায় মৃত্যু।

মায়ের বা গর্ভবতীর ওপর প্রভাব : উচ্চরক্তচাপ, গর্ভফুল বিচ্ছিন্ন হওয়া, খিঁচুনি, রক্তশূন্যতা, সময়ের পূর্বেই প্রসব, হৃদযন্ত্রের জটিলতা, প্রস্রাবের সংক্রমণ, প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ বিষণœতা, প্রসব-পরবর্তী থাইরয়েডাইটিস, স্থায়ী হাইপোথাইরয়েড, পরে বন্ধ্যত্ব।

লক্ষণগুলো

হাইপোথাইরয়েডিজম : ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, শুষ্ক ত্বক, কোষ্ঠকাঠিন্য, বিষণœতা, ধীর হৃদস্পন্দন।

হাইপার থাইরয়েডিজম : ওজন হ্রাস, অতিরিক্ত ঘাম, কাঁপুনি, দ্রুত হৃদস্পন্দন, অস্থিরতা, নার্ভাসনেস।

এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, থাইরয়েড সমস্যার কিছু লক্ষণ প্রায়ই গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক লক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়, তাই নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম ট্রাইমেস্টারেই এই সমস্যাটি বেশি দেখা যায়, অনেক মায়েদেরই মাঝারি বা কোনো লক্ষণই থাকে না। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং করা খুবই জরুরি।

চিকিৎসা

বিপাক প্রক্রিয়া সক্রিয় করার জন্য হালকা ব্যায়াম, যোগব্যায়াম করা। প্রোটিন, ফাইবারযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ। মানসিক চাপ বা ংঃৎবং কমানো, নিয়মিত ঘুমানো। খাদ্য তালিকায় গ্লুটেন জাতীয় খাদ্য ব্রেড, সিরিয়াল, পাস্তা-নুডলস; চা-কফি, গ্রিন টি, সয়া মিল্ক বাদ বা কমাতে হবে। ব্রকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শালগম, বেগুন, পালংশাক ইত্যাদি খাদ্য তালিকায় কমাতে হবে।

HRT (Hormone replacement Therapy)

হাইপোথাইরয়েডিজম : লিভোথাইরক্সিন ট্যাবলেট

নির্দেশিত মাত্রা : ১ম তিন মাস : ০.১-২.৫ ক্রমস, ২য় তিন মাস : ০.২-৩.০ ক্রমস, ৩য় তিন মাস : ০.৩-৩.৫ ক্রমস

গর্ভাবস্থায় প্রতি ৪-৬ সপ্তাহ পরপর ঞঝঐ-এর মাত্রা দেখে ওষুধের ডোজ সমন্বয় করতে হয়। থাইরয়েড ওষুধের সঙ্গে আয়রন বা ক্যালসিয়াম এড়িয়ে চলতে হবে, খালি পেটে খেতে হবে। থাইরয়েড অ্যান্টিবডি উপস্থিত থাকলে সতর্ক হতে হবে কেননা এক্ষেত্রে জটিলতা বেশি।

প্রসবের পর ওষুধের মাত্রা সাধারণত কমাতে হয়, তাই ৪-৬ সপ্তাহের মধ্যে হরমোন পরীক্ষা করাতে হবে।

হাইপারথাইরয়েডিজম : কার্বিমাজল, মেথিমাজল, প্রোপাইল থায়ো ইউরাসিল। এক্ষেত্রে চিকিৎসা কিছুটা জটিল এবং হরমোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রয়োজন।

পরিশেষে  আয়োডিনযুক্ত লবণ খাওয়া, রেডিয়েশন মুক্ত থাকা,  দ্রুত রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা নেওয়া, শনাক্ত হওয়ার পর নিজ থেকে ওষুধ বন্ধ না করা।

এই পদক্ষেপগুলো মেনে চললে গর্ভবতী মায়েদের থাইরয়েড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে। সে সঙ্গে লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা, প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয়, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সঠিক ওষুধ বিধি মেনে চলা একান্ত প্রয়োজন। জটিলতা কমাতে গাইনি ও হরমোন বিশেষজ্ঞ অধীনে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত