শীতের তীব্রতার সর্ম্পকে হাদিসের ব্যাখ্যা

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:১২ পিএম

প্রকৃতিতে এখন শীতের আমেজ। আধুনিক বিজ্ঞান একে ব্যাখ্যা করে সূর্যের অবস্থান, পৃথিবীর অক্ষ ও বাতাসের গতিপথ দিয়ে। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিতে এই তীব্র শীত কি কেবলই আবহাওয়ার পরিবর্তন, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর গায়েবি বাস্তবতাও রয়েছে?

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বর্ণিত হাদিস আমাদের এই প্রশ্নের দিকে নতুন এক দৃষ্টিতে তাকাতে শেখায়-যেখানে দুনিয়ার ঠান্ডা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আখিরাতের এক ভয়াবহ বাস্তবতা।

বিশ্বাসই মূল ভিত্তি

এ বিষয়ে আলেমরা সর্বপ্রথম যে মূলনীতির কথা বলেন, তা হলো একজন মুমিনের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতিটি বাণী নিঃশর্তভাবে সত্য বলে বিশ্বাস করা। কারণ আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন-

وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ ۝ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ

‘তিনি (নবী) নিজের খেয়াল থেকে কিছু বলেন না। এটি তো কেবল ওহি, যা তার প্রতি নাজিল করা হয়।’ (সুরা আন-নাজম: আয়াত ৩-৪)

এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুল (সা.)–এর হাদিস বর্ণনার সময় বলতেন ‘আস-সাদিকুল মাসদুক’ অর্থাৎ, তিনি সত্যবাদী এবং সত্যে সমর্থিত।

হাদিসে শীত ও গ্রীষ্ম সম্পর্কে কী বলা হয়েছে? হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে

اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا فَقَالَتْ: يَا رَبِّ أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا، فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ، نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ

‘জাহান্নাম তার রবের কাছে অভিযোগ করল- হে আমার রব! আমার এক অংশ আরেক অংশকে গ্রাস করছে।’ তখন আল্লাহ তাকে বছরে দুটি নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুমতি দিলেন একটি শীতে, একটি গ্রীষ্মে।’

فَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الْحَرِّ مِنْ سَمُومِهَا، وَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الْبَرْدِ مِنْ زَمْهَرِيرِهَا

‘তোমরা যে প্রচণ্ড গরম অনুভব কর, তা জাহান্নামের উত্তাপ থেকে। আর যে তীব্র শীত অনুভব কর, তাও জাহান্নামের জমহরির (চরম ঠান্ডা) থেকে।’ (বুখারি ৩২৬০; মুসলিম ৬১৭)

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে- মানুষ যে ধ্বংসাত্মক গরম ও ধ্বংসাত্মক শীত অনুভব করে, তার উৎসও জাহান্নাম।

পৃথিবীর বাস্তবতার সঙ্গে এই হাদিস কিভাবে মেলে?

আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন-পৃথিবীর সব অঞ্চলে একসঙ্গে গরম বা ঠান্ডা অনুভূত হবে-এমন কোনো দাবি হাদিসে নেই। সূর্যের অবস্থান, সমুদ্রঘেঁষা অঞ্চল, বাতাসের প্রবাহ, বৃষ্টি, অক্ষাংশ ও ভৌগোলিক গঠন এসব দৃশ্যমান কারণেই কোথাও শীত বেশি, কোথাও কম; কোথাও গ্রীষ্ম তীব্র, কোথাও মৃদু হয়।

ইউরোপের বহু এলাকায় গ্রীষ্ম অপেক্ষাকৃত শীতল থাকার পেছনেও সামুদ্রিক বাতাস ও নিয়মিত বৃষ্টির বড় ভূমিকা রয়েছে।

দৃশ্যমান কারণের পাশাপাশি গায়েবি কারণ

তবে আলেমরা বলেন, এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। ইসলাম দৃশ্যমান কারণের পাশাপাশি গায়েবি বা অদৃশ্য কারণের অস্তিত্বও স্বীকার করে- যা আমরা কেবল ওহির মাধ্যমে জানতে পারি। তাদের মতে-

কুরআনেই জমহরির শাস্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন

لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْسًا وَلَا زَمْهَرِيرًا

‘সেখানে তারা সূর্যের তাপও দেখবে না, আবার জমহরির ঠান্ডাও নয়।’ (সুরা আল-ইনসান: আয়াত ১৩)

(এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, জমহরির একটি স্বতন্ত্র শাস্তি রয়েছে।)

আলেমদের ব্যাখ্যায় জানা যায়, সূর্যের অবস্থান, সমুদ্রের বাতাস, বৃষ্টি, ভৌগোলিক অবস্থান ইত্যাদি কারণে পৃথিবীর আবহাওয়া বিভিন্ন হয়। তবে এদের সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে অদৃশ্য এক কারণ যা শুধু ওহীর মাধ্যমে জানা যায়। অর্থাৎ প্রকৃতির দৃশ্যমান কারণ এবং আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে যাওয়া অদৃশ্য কারণ একসঙ্গে কাজ করে।

শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন (রহ.) বলেছেন, গরম ও শীতের প্রাকৃতিক কারণ থাকলেও হাদিসে বর্ণিত অদৃশ্য কারণকে অস্বীকার করা উচিত নয়। যেমন সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক কারণ থাকা সত্ত্বেও তা আল্লাহর ইচ্ছার নিদর্শন, তেমনি গরম-ঠান্ডাও মহান আল্লাহর কুদরতের একটি প্রকাশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত