সবার আগে বাংলাদেশ ব্যক্তি নয় রাষ্ট্রই মুখ্য

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০৪ এএম

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে ওঠায়, গণতন্ত্র ও সুশাসন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির দীর্ঘ ক্ষত নিরাময় এবং রাষ্ট্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান উচ্চারণ করেছেন এক বৈপ্লবিক দর্শন ‘সবার আগে বাংলাদেশ ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রই মুখ্য।’ বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন এই সেøাগানটি কেবল একটি আবেগীয় রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং রাষ্ট্র মেরামতের এক সময়োপযোগী অঙ্গীকার। এটি ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠে, রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়, যা দীর্ঘদিনের জবাবদিহিহীন শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তির দিশারি হিসেবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। গত কয়েক দশকে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষত হয়েছে ব্যক্তিপূজার মাধ্যমে। যখন রাষ্ট্রের অর্জন একজন ব্যক্তির নামে চলে আসে এবং ব্যর্থতার দায় এড়ানো হয়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো অকেজো হয়ে যায়। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ব্যক্তির অনুগত হয়, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ সহজ হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকারিতার দিক থেকে বৈশি^ক মানদণ্ডে পিছিয়ে গেছে। তারেক রহমানের এই দর্শন অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভকে ব্যক্তির প্রভাবমুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ ক্ষমতায় কে থাকল সেটি বড় কথা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলো আইন অনুযায়ী চলছে কিনা, সেটিই হবে মানদণ্ড।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক স্বাধিকার। একটি রাষ্ট্র তখনই মুখ্য হয়, যখন তার সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত না থেকে জনগণের কল্যাণে ব্যয় হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে ভয়াবহ এক ডলার সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা স্বজনপ্রীতির পুঁজিবাদ। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। এই বিশাল অংকের অর্থ পাচার তখনই সম্ভব হয় যখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ব্যাংকিং খাতে যে অরাজকতা ও খেলাপি ঋণের পাহাড়  তৈরি হয়েছে (যা বর্তমানে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার বেশি), এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের ‘রাষ্ট্রই মুখ্য’ দর্শনের অর্থ হলো রাষ্ট্রের সম্পদ কোনো সিন্ডিকেটের হাতে কুক্ষিগত না রেখে জনগণের আমানত হিসেবে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট করে দেখাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৫.৮ শতাংশে, যা গত এক দশকের গড়ের তুলনায় কম। এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি ক্রয়ক্ষমতা ও দারিদ্র্যের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এমন সংকটের পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা বৈশি^ক মন্দার প্রভাব থাকলেও, দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহির অভাব প্রধান ভূমিকা রেখেছে। যখন একটি রাষ্ট্র কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই ‘রাষ্ট্রই মুখ্য’ দর্শন কেবল রাজনৈতিক সংস্কার নয় এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী নীতিনির্ধারণের পূর্বশর্ত। জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার কোনো বিকল্প নেই। 

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বৈশি^ক রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় পররাষ্ট্রনীতিকে ব্যক্তিগত ক্ষমতা রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রই মুখ্য’নীতি অনুসরণ করলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে দ্বিপাক্ষিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ। ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হবে বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত জাতীয় স্বার্থ। ট্রানজিট, কানেকটিভিটি বা প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি বজায় থাকলে, দেশ কোনো বিশেষ বলয়ে বন্দি হবে না। এটি নিশ্চিত করবে যে, বিদেশি শক্তির সমর্থন কোনো ব্যক্তির মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। এই জেনারেশন-জেড বা নতুন প্রজন্মের কাছে পুরনো ধাঁচের ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি আর গ্রহণযোগ্য নয়। তারা চায় এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার লাইসেন্স পাওয়া পর্যন্ত, সব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচিতি যখন আবশ্যিক হয়ে পড়ে, তখন মেধাবীরা দেশত্যাগে বাধ্য হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এই জনশক্তিকে দেশে ধরে রাখতে হলে রাষ্ট্রকে একটি মেধাভিত্তিক কাঠামোতে রূপান্তর করতে হবে। তারেক রহমানের এই আহ্বানের মধ্যে তরুণদের প্রতি সেই প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যেখানে রাষ্ট্র কোনো বিশেষ দলের বা ব্যক্তির ক্যাডারদের স্বার্থরক্ষা করবে না, বরং প্রতিটি যোগ্য নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করবে।

রাষ্ট্রকে মুখ্য করার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো, ক্ষমতার ভারসাম্য। বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর অসীম ক্ষমতা পর্যন্ত যে কেন্দ্রীভূত কাঠামো রয়েছে, তা ব্যক্তিকে একনায়ক বানানোর সুযোগ করে দেয়। তারেক রহমান প্রস্তাবিত  রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফার মূল দর্শনই হলো এই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, একই ব্যক্তির দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী না হওয়া এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করার প্রস্তাবগুলো মূলত রাষ্ট্রকে ব্যক্তির হাত থেকে রক্ষার কবজ। যখন একজন ব্যক্তি জানবেন যে, তার ক্ষমতা সীমিত এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, তখনই তিনি রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে বাধ্য হবেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আমরা দেখেছি বিচারহীনতার সংস্কৃতি। গুম, খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে বিভীষিকা আমরা গত দেড় দশকে দেখেছি, তা মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যক্তির প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ফল। আইনের চোখে সবাই সমান এই চিরায়ত বাণীকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ হতে হবে। তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনটি আসলে নাগরিকের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই। যখন রাষ্ট্র মুখ্য হবে, তখন একজন দিনমজুরের অধিকার আর একজন মন্ত্রীর অধিকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। একটি সেøাগানকে দর্শনে এবং সেই দর্শনকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সহজ নয়। কয়েক দশকের দুর্নীতির সিন্ডিকেট ও সুবিধাবাদী আমলাতন্ত্র এই রূপান্তরের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে ছাত্র-জনতার জুলাই ’২৪ আন্দোলনের পর দেশের মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তা পরিবর্তনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

এই উত্তরণের পথে আমাদের কয়েকটি মৌলিক সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমত, প্রশাসনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে হবে। ই-গভর্ন্যান্স চালু হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে এবং নাগরিক ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগকে নির্বাহী ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা ছাড়া রাষ্ট্র নাগরিকের আস্থা অর্জন করতে পারবে না। তৃতীয়ত, আমলাতন্ত্রের আনুগত্য নিশ্চিত করতে হবে আইন ও নীতির প্রতি, কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি নয়। স্বচ্ছতা ও দক্ষতা প্রতিষ্ঠিত না হলে, রাষ্ট্রযন্ত্র কখনোই জনগণের প্রকৃত সেবকে পরিণত হতে পারে না। এই না পারার দায়, পুরোপুরি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন সরকারের। সবশেষে বলা যায়, ইতিহাস সাক্ষী যেসব জাতি ব্যক্তিকে পূজা করেছে তারা একসময় ধ্বংস হয়েছে আর যারা রাষ্ট্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে তারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রই মুখ্য’ বক্তব্যকে কেবল রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখলে ভুল হবে, এটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রের রূপরেখা। বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জমিদারি নয়, এটি শহীদদের রক্তে গড়া এক পবিত্র আমানত। আগামীর বাংলাদেশে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই হবে শক্তির কেন্দ্র। রাষ্ট্রই হবে নাগরিকের নিরাপদ আশ্রয়। আমাদের অঙ্গীকার হোক আইনের শাসন হবে পথনির্দেশক, দেশপ্রেম হবে চালিকাশক্তি। ব্যক্তি আসবে-যাবে, কিন্তু বাংলাদেশ চিরকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই দর্শন ধারণ করতে হবে, এই মুহূর্তে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দলকে। বিশেষ করে, আসন্ন নির্বাচনে যারা বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। আমরা বিশ^াস করি, আন্তরিকতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে দেশকে উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়া দুরূহ কোনো বিষয় নয়।

লেখক: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত