রক্তদান মানে শুধু একটি জীবন বাঁচানো নয়, বরং মানবতার সেতুবন্ধন গড়ে তোলা। এই কথাটিই বাস্তব প্রমাণ করেছেন মিঠু দেবনাথ। তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। পড়াশোনা করেছেন ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে মাস্টার্স পর্যন্ত। নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তার শিক্ষাজীবন শুরু, এরপর ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজ এবং শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন।
রক্তদানের শুরুটা সহজ ছিল না। আত্মীয়কে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে গিয়ে ব্লাড ব্যাংকের সামনে রোগীর স্বজনদের আহাজারি প্রথম নাড়া দেয় মিঠুকে। সেদিনই তিনি বুঝলেন, রক্ত তৈরি করা যায় না, কেবল একজন সুস্থ মানুষই আরেকজনের জীবন বাঁচাতে পারে। তখন থেকেই তিনি ছোট ছোট উদ্যোগ নেন। বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতদের রক্ত পরীক্ষা করিয়ে এক সময় তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন নিয়মিত রক্তদাতা।
২০০৮ সাল থেকে এ যাত্রা শুরু। এখন পর্যন্ত ৪৯ বার হোল ব্লাড এবং ৩৫ বার প্লাটিলেট দান করেছেন, অর্থাৎ মোট ৮৪ বার। তার লক্ষ্য অন্তত ১০০ বার রক্ত দিয়ে অন্যের জীবন বাঁচানো। তিনি বলেন, ‘যখনই কেউ রক্ত চায় আর আমার সময় হয়, ঢাকার যেকোনো প্রান্তেই রাত-বিরাতে ছুটে যাই। ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক আমি চেষ্টা করি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে।’
রক্তদানে চ্যালেঞ্জও আছে। অনেক হাসপাতাল, বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রক্তদাতাদের গুরুত্ব দিতে চায় না। এতে ডোনাররা অসহায় পরিস্থিতিতে পড়ে যান। তবে এসব উপেক্ষা করেই এগিয়ে যান মিঠু। তার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তখনই আসে, যখন গভীর রাতে বা প্রচন্ড শীতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় রক্তের প্রয়োজনে। কিন্তু রোগীর সুস্থতার খবর পেলেই তিনি নিজের সব কষ্ট ভুলে যান।
রক্তদানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার অনেক স্মৃতি। আনন্দের স্মৃতি হলো, যখন কোনো গর্ভবতী মা রক্ত পেয়ে সুস্থ হয়ে সন্তানের মুখ দেখতে পারেন। আবার সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত হলো, রক্ত দেওয়ার পরও যদি রোগীকে বাঁচানো না যায়। এই সুখ-দুঃখই তাকে নতুন করে মানবসেবায় অনুপ্রাণিত করে।
পরিবার থেকেও তিনি যথেষ্ট সমর্থন পেয়েছেন। প্রথম দিকে কিছু বাজে কথা শুনতে হলেও আজ পরিবার ও আত্মীয়স্বজন সবাই রক্তদানে উৎসাহিত। তার ছোট ভাইসহ আত্মীয়স্বজন নিয়মিত রক্ত দেন। তবে বাবার অভাব তিনি বিশেষভাবে টের পান। রক্তদান শেষে বাড়ি ফেরার পর বাবা সবসময় আতা, পাকা পেঁপে, ডালিম, পেয়ারা এনে দিতেন। আজ আর কেউ সেই ভালোবাসা দেখান না। তবু মা এখনো রক্তদান শেষে আদর করে রান্না করে রাখেন, যেন মায়ের মমতা সব শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা করে।
এখন পর্যন্ত ঢাকার প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেই রক্ত দিয়েছেন তিনি। ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, বারডেম, পিজি হাসপাতাল, পুলিশ হাসপাতাল থেকে শুরু করে বেসরকারি হাসপাতাল ল্যাবএইড, সামরিতা, ডেল্টা, গ্রিন লাইফ, হার্ট ফাউন্ডেশনসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে তার পদচারণা রয়েছে।
মিঠু দেবনাথ মনে করেন, সরকার চাইলে রক্তদানের কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত করতে পারে। প্রতিটি ডোনারকে সরকারি রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এনে, একটি জাতীয় হেল্পলাইন থাকলে রোগীর জন্য সহজেই রক্তের ব্যবস্থা করা যেত। এ ছাড়া যারা রক্ত দেন তাদের জন্য বিশেষ ছুটির ব্যবস্থা থাকলে অনেক জটিলতা এড়িয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদান করতে পারতেন রক্তদাতারা।
রক্তদাতাদের জন্য তার পাঁচ পরামর্শ হলো সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত পানি পান করা, আয়রন-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নেওয়া, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং রক্তদানের আগে হাসপাতালের পরিবেশ ও নিডেলের মেয়াদ যাচাই করা।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে তিনি বলেন, ‘একদিন বাংলাদেশ এমন হবে, যেখানে রক্তের অভাবে কেউ মারা যাবে না। রক্তদাতা খুঁজে নেবে রোগীকে আর রক্ত দালালদের কোনো স্থান থাকবে না।’
মিঠু দেবনাথ শুধু রক্তদানেই সীমাবদ্ধ নন। ঈদের সময় দরিদ্রদের মাঝে উপহার বিতরণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, দুর্যোগকালে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমেও তাকে পাওয়া যায়। তবে রক্তদানই তার জীবনের প্রধান অঙ্গীকার।
মানবতার এই অসাধারণ কাজের জন্য মিঠু দেবনাথ আজ হাজারো রক্তদাতার অনুপ্রেরণা।
লেখক : ফিচার রাইটার
