গাইবান্ধা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল্লাহ নাহিদ নিগারের একটি ভুয়া ভিডিও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের দিন সকালে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলতে দেখা যায়। পরে এটি ডিপফেক বা এআই তৈরী ভুয়া ভিডিও হিসেবে প্রমাণিত হয়। এই ঘটনা বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারে ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহারের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
জার্মান সংস্থা কনরাড অ্যাডেনয়ার ফাউন্ডেশন (কেএএস) এর ‘নির্বাচনে ডিপফেকের প্রভাব’ শীর্ষক ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, স্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা, ভারত, পোল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ডিপফেকের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারির আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের একটি ডিপফেক ভিডিও ছড়ানো হয়, যাতে তাঁকে ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করতে দেখা যায়।
ফ্যাক্টচেকার মিনহাজ আমান বলেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল সাক্ষরতার অবস্থা করুণ। নির্বাচন বর্জন বা প্রার্থীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এআই তৈরী ভিডিও ছড়ালে তার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের শুরুতে এআই এখনকার মতো এতটা উন্নত ও সহজলভ্য না থাকলেও বর্তমানে ডিপফেক ও চিপফেক (সস্তা সফটওয়্যারে রূপান্তর) প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব সহজেই বাস্তবসম ভুয়া অডিও-ভিডিও তৈরি করা সম্ভব।
বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, দেশে অপতথ্য ছড়ানোর জন্য ডিপফেক ও চিপফেকসহ কমপক্ষে ১০টি কৌশল ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে: সত্য ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে বিভ্রান্তিকর ক্যাপশন যুক্ত করা, বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা, মনগড়া বক্তব্য নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে চালানো, পুরনো ঘটনাকে সাম্প্রতিক হিসেবে উপস্থাপন করা ইত্যাদি।
ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপতথ্য ছড়ানোর ৬৬ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ভুয়া ভিডিও তৈরিতে এআই ব্যবহার বাড়ছে।
রিউমর স্ক্যানারের তথ্যমতে, গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ১ হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যার ৯৫৬টি ছিল রাজনৈতিক। এগুলোর মধ্যে সরাসরি মিথ্যা ছিল ১ হাজার ৫১টি।
ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, অপতথ্য ছড়ানো অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হলেও এর পেছনে কারা আছেন, তা বের করতে তদন্ত প্রয়োজন। তাঁর মতে, অপতথ্য ছড়ানোর সঙ্গে রাজনৈতিক বা আদর্শিকভাবে অনুপ্রাণিত ব্যক্তি এবং আর্থিক সুবিধার জন্য কাজ করা ব্যক্তিরা জড়িত।
ফ্যাক্টচেকারদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভুয়া পরিচয়ে তৈরি ‘বটবাহিনী’ নামে একাধিক অনলাইন গ্রুপ রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এছাড়া, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও অনলাইনে অপতথ্য ছড়িয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ) আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত অপতথ্য মোকাবিলায় একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে। পুলিশের সাইবার পুলিশ সেন্টারও নির্বাচনীকালীন ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলছেন, সাইবার আক্রমণ ও ডিপফেকের কারণে বিশ্বের অনেক দেশে নির্বাচন পেছানোর নজির থাকলেও বাংলাদেশে এর বিপরীতে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা প্রতিহত করতে সময় লাগে। এতে অনেকেই ভুয়া তথ্য বিশ্বাস করে ফেলেন। এমনকি কিছু রাজনৈতিক নেতা ও গণমাধ্যমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে বক্তব্য দিচ্ছেন বা খবর প্রকাশ করছে। সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার এআই তৈরী ভুয়া ছবি দুটি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
