দুর্নীতি কমবেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হয়, অথবা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যেন একটু বেশি এগিয়ে। যার ফলে উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ছি। দুর্নীতি শুধু আর্থিকই নয় দায়িত্বে অবহেলা, জবাবদিহি না করাও দুর্নীতির মধ্যে পড়ে। বলা ভালো, নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করা দুর্নীতির মধ্যেই পড়ে। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি নিশ্চিতভাবেই প্রত্যেকের উত্তর ভিন্ন হবে। কিন্তু তরুণরা কী ভাবছে দেশ নিয়ে? আর তাদের কাছে কোন জিনিসটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? এসব ভাবনা জানতে বিওয়াইএলসি আয়োজন করেছিল ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে। সেখানে তরুণদের কাছ থেকে যে উত্তরগুলো পাওয়া গেছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তাদের মতে বাংলাদেশের সামনে এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘বেকারত্ব সমস্যা’। তথ্য ও পরিসংখ্যান একই কথা বলছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের উপযুক্ত কাজ পাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩৩ শতাংশ জনগোষ্ঠী হচ্ছে তরুণ। আর একটা বড় অংশই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। এ ব্যাপারে ভয়াবহ তথ্যটি হচ্ছে, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করার পরেও মিলছে না কাজের সুযোগ। বরং তাদের মধ্যেই বেকারত্বের হার বেশি। এর নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের প্রধান কারণ হচ্ছে শুধুমাত্র ফলাফলকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা। যে কারণে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত অসংখ্য শিক্ষার্থী থাকলে, তাদের মধ্যে মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট ধারণা থাকে না। একই সঙ্গে অনেকেই বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করে এলেও, প্রয়োগ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানের অভাব থেকে যায়।
কিছু ক্ষেত্রে একাডেমিক পড়াশোনার খুব বেশি দরকার না হলেও নির্দিষ্ট দক্ষতার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রেই বেশির ভাগ তরুণ পিছিয়ে পড়ে। দেখা গেল, কারও একাডেমিক ফলাফল অনেক ভালো কিন্তু যে ন্যূনতম দক্ষতার প্রয়োজন তা তাদের নেই। এসব ব্যাপারে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মন্তব্য হলো, তাদের অনেক দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী তারা দক্ষ লোকবল পাচ্ছেন না। অর্থাৎ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং চাকরি প্রত্যাশীদের মধ্যে একটা ‘গ্যাপ’ থেকে যায়। তবে এরপরও চাকরির নতুন ক্ষেত্র যে খুব বেশি তা নয়। যে পরিমাণ তরুণ প্রতিবছর গ্র্যাজুয়েশন করে বের হচ্ছে, সে পরিমাণ কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান এখন যথেষ্ট ভালো হলেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের ব্যাপারে তরুণদের মধ্যে বেশ কিছু মতামত রয়েছে। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মনে করে, তাদের আসলে দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যাপারে কিছু করার নেই। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে, বিগত তিন বছর ধরে অনেক কষ্টে আছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিককালে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুসারে, ওই মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১.৬৬ শতাংশ। জুন মাসে ছিল ৯.৭২ শতাংশ। জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল আগের ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪.১০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি হ্রাসে বর্তমানে অন্তর্র্বর্তী সরকার সংকুচিত মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। নীতি সুদহার বাড়িয়েছে ১০ শতাংশ। কিছু পণ্যে কর ও শুল্কহার কমিয়েছে, কিন্তু রাজস্ব আহরণে সরকারের অক্ষমতার কারণে আয় সীমিত রয়েছে। অথচ কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ সার্বিক ব্যয় বৃদ্ধি রাজকোষে চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে। বিগত সরকারের আমলে নীতি সুদহার মূল্যস্ফীতির হারের অনেক নিচে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে ঋণের প্রবাহ বেড়েছে। বিদেশে টাকা পাচার হয়েছে। দুর্বৃত্তায়নে রুগ্ণ হয়ে গেছে ব্যাংক খাত। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের লোকসানের বদৌলতে আর্থিক সুবিধা নিয়েছে কিছু সংখ্যক স্বার্থান্বেষী মানুষ। চলমান উচ্চমূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির হার কুলিয়ে উঠছে না। ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর কষ্টের বোঝা বাড়ছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৪ শতাংশ। এটি মূল্যস্ফীতির হার ৮.২৯ শতাংশ থেকে কম। কয়েক মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমই পর্যবেক্ষণ করা গেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বেকারত্ব। জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নেমে এসেছে শ্লথগতি। এতে বেড়েছে দারিদ্র্য। বেড়েছে সাধারণ মানুষের দুর্গতি। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে মূল্যস্ফীতির হারকে দ্রুত কমানো দরকার। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণের সঙ্গে সরকারের ব্যয় কমানো দরকার। উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজারে পণ্য সরবরাহ নির্বিঘœ করা দরকার। সিন্ডিকেটের কারসাজি থেকে ভোক্তাদের মুক্ত করা দরকার। উচ্চমূল্যস্ফীতির সঙ্গে অর্থনীতির আরেকটি দুষ্টক্ষত ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব আমাদের সমাজজীবনকে কুরে খাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলার ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের দামে ঊর্ধ্বগতি এবং ঋণের উচ্চসুদ শিল্পোদ্যোগকে দমিয়ে রাখছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে এখন চরম খরা চলছে। এতে নতুন কর্মসংস্থানে ভাটা পড়েছে। এক হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি মানুষ বেকার। শিক্ষিত বেকারত্বের হার বেশি। প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক শ্রমবাজারে আসছে, কিন্তু তাদের চাকরি নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অন্যান্য কারণে একের পর এক অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। গার্মেন্টস সেক্টরে এর প্রভাব বেশি। এতে বেকার হয়ে গেছে লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষ। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয় প্রাইভেট সেক্টরে, কিন্তু বর্তমানে তা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। বেশির ভাগ ঋণ চলে যাচ্ছে সরকারি খাতে। বেসরকারি খাত এতে বড় ধরনের বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। এখন তা ২৭ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ থেকে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ শতাংশে। অনেক উদ্যোক্তা অপেক্ষা করে আছেন এই ভেবে যে, সামনে ঋণের সুদহার কমবে এবং নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসবে, তখন সব দিক দেখেশুনে তারা বিনিয়োগ করবেন। শিল্পের উৎপাদনে ও ব্যবসা-বাণিজ্যে শান্তির পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া তার প্রতিবিধান দুষ্কর। বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ১৫ মাস ধরে আমরা একটি অবস্থানশীলতা কাল অতিক্রম করছি। উচ্চমূল্যস্ফীতির সঙ্গে রয়েছে কর্মসংস্থানের বন্ধ্যত্ব। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা বর্তমান সরকারের হাল ধরে আছেন। তা সত্ত্বেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তেমন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। হয়তো আমরা আরও ঘনিষ্ঠভাবে উন্নয়নের সঙ্গে নিবিষ্ট হতে পারিনি অথবা ততটা সময়ও পাওয়া যায়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে লালিত উচ্চদারিদ্র্যের হারে কোনো উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে। চলতি বছর এই হার ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। কর্মসংস্থানের সংকট, চাকরি হারানো, স্থবির মজুরি এবং উচ্চমূল্যস্ফীতি এই দারিদ্র্য বৃদ্ধির মূল কারণ। দেশে বর্তমানে সোয়া ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। গত দুই বছরে ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরও প্রায় ৮ লাখ মানুষের বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অধিকন্তু সামাজিক সুরক্ষা খাতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে বৈষম্য কমছে না। সে ক্ষেত্রে নারীরা বড় বৈষম্যের শিকার। অন্তর্র্বর্তী সরকারের হাতে আর অল্প কয়েক মাস সময় আছে। এই স্বল্প সময়ে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব না হলেও তার গোড়াপত্তন করে যাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে এটা ঠিক, কিন্তু সেই উন্নয়ন সর্বতোভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত উন্নয়ন। বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে অনুধাবন করা যায়, এখানে অতি উন্নয়ন এবং অতি দুর্নীতির এক মহাসম্মিলন ঘটেছে।
বিগত সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের ‘রোল মডেলে’ পরিণত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হয়েছিল। বাইরের দুনিয়াকে দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখানো হলেও সেই উন্নয়ন ছিল সর্বতোভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। যেসব উন্নয়নকর্ম সাধন করা হয়েছে সেটা কতটা টেকসই এবং গুণগত মানসম্পন্ন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা সবাই কথা বলি, কিন্তু সমাজে দুর্নীতির ব্যাপক উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায়। বিগত সরকার আমলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা বলা হলেও তা ছিল মূলত ধাপ্পাবাজি। কারণ সরকারের সর্বোচ্চ মহলের প্রত্যক্ষ মদদে দুর্নীতি সাধিত হয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরাচারী সরকারের উন্নয়নের মূল লক্ষ্য থাকে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করা। বিগত সরকার আমলেও আমরা সেই অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছি। দেশে যদি সুনাগরিক গড়ে তোলার উপযোগী শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করা যেত, তাহলে দুর্নীতির মাত্রা কিছুটা হলেও হ্রাস পেত। উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সত্যিকার দেশপ্রেমিক একজন মানুষ কখনো দুর্নীতি করতে পারেন না। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান করছি। কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক এবং আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে তার খোঁজ রাখছি না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, মানুষের সুকুমার বৃত্তিকে জাগ্রত করে তাকে একজন আদর্শ-দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। দুর্নীতি একটি সমাজের সবচেয়ে বড় শত্রু। দুর্নীতি সমাজিক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাকে ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করছে। কোনোভাবেই দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা যাবে না। যারা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বিচারের মাধ্যমে তাদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্নীতিবাজরা দেশ ও জাতির শত্রু, এদের কোনো ক্ষমা নেই। জাতি হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
লেখকঃ গবেষক ও কলাম লেখক
