শীত এলে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়রিয়া ও চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পায়। এবারও ব্যতিক্রম নয়। শীতজনিত রোগে বিপর্যস্ত জনজীবন। অনেকেই আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ভুগেছে, ভুগছে। অনেকে প্রাণ হারাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মাস ১০ দিনে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ৪৬ এবং ডায়রিয়ায় ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে দেশের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৪ হাজার ৯০০ জন। শ্বাসতন্ত্রের রোগী বেশি নরসিংদীতে, মৃত্যু বেশি হয়েছে খাগড়াছড়ি জেলায়। যদিও এ জেলায় ভর্তির সংখ্যা তুলনামূলক কম। ডায়রিয়া নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৭৯ হাজার ৯২৮ জন। বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে। এরপর ঢাকা বিভাগে, তারপর খুলনা। এদিকে এখন ঢাকার শিশু হাসপাতালে আসা ৩০ শতাংশের ঠান্ডাজনিত রোগ।
২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে দেশের সরকারি হাসপাতালে ৩৪ হাজার ৯০০ জন ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪৬ জনের। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে খাগড়াছড়ি জেলায়; ১৬ জন। এরপর ময়মনসিংহে ১১ জন। রংপুরে ৬, খুলনায় ৬, সিলেটে ৪, নরসিংদী ২ ও চুয়াডাঙ্গায় ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে বেশি মৃত্যুর পেছনে তিনটি কারণের কথা জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের। তিনি বলেন, দুর্গম কিছু এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। কিছু এলাকায় মানুষের মধ্যে রয়েছে ভুল ধারণা। তারা বনাজি চিকিৎসা গ্রহণ করে। বেশিরভাগ মাকে সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার প্রবণতা কম। এই তিনটি কারণে তারা খুব দেরিতে; বলা যায় শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসে। তখন আর কোনো উপায় থাকে না। এসব কারণে এ জেলায় মৃত্যু বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শীতের এই ২ মাস ১০ দিনে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে ঢাকা মহানগরের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪০৪ জন। ঢাকা বিভাগে ৯ হাজার ৭৭৪ জন। ঢাকা বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নরসিংদী জেলায়। এই এক জেলায় ভর্তি হয়েছে ৬ হাজার ৩৬০ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ভর্তি হয়েছে ৯ হাজার ২৬১ জন। বেশি ভর্তি হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর ও কুমিল্লায়। খাগড়াছড়িতে ১৬ জনের মৃত্যু হলেও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা তুলনামূলক কম। ভর্তি হয়েছে ৪৭২ জন। খুলনা বিভাগে ৫ হাজার ১১৫ জন। সিলেটে ৩ হাজার ৮৮৫ জন। এই বিভাগে ভর্তি বেশি হয়েছে সিলেট ও মৌলভীবাজারে। রংপুর বিভাগে ১ হাজার ৮৯১, রাজশাহী বিভাগে ১ হাজার ৪৩০ ও বরিশালে ১ হাজার ৬৫ জন।
রাজধানীর ডেমরা এলাকার বাসিন্দা মারিয়া মুস্তফা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। প্রতিদিন খুব সকালে অফিসে যেতে হয়। ঠান্ডায় তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, এত বেশি শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় যে, আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ‘শীতে প্রধানত বাড়ে শ্বাসতন্ত্রের রোগ। যদিও এসব রোগের প্রধান কারণ ভাইরাস, তবে বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেসব এনজাইম আছে, তা স্বাভাবিকের চেয়ে কম তাপমাত্রায় কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। শীতে বাতাসের তাপমাত্রা কমার সঙ্গে আর্দ্রতাও কমে যায়, যা আমাদের শ্বাসনালির স্বাভাবিক কর্মপ্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করে ভাইরাসের আক্রমণকে সহজ করে তোলে। এমনকি শুষ্ক আবহাওয়া বাতাসে ভাইরাস ছড়ানোতেও সহায়তা করে। এ ছাড়া ধুলোবালির পরিমাণ বেড়ে যায়। ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাস ইত্যাদি হাঁপানি রোগীর শ্বাসনালিকে সরু করে দেয়, ফলে হাঁপানি, সিওপিডি এবং এমফাইসিমার প্রকোপ আরও বাড়ে।’
তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যসমস্যার মধ্যে সাধারণ ঠান্ডাজনিত সর্দি-কাশি বা কমন কোল্ড একটি পরিচিত নাম। এ রোগের শুরুতে গলাব্যথা ও শুকনা কাশি দেখা দেয়, নাক বন্ধ হয়ে যায়, নাক দিয়ে অনবরত পানি ঝরতে থাকে এবং ঘন ঘন হাঁচি হতে থাকে। হালকা জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করা, দুর্বল লাগা ও ক্ষুধামান্দ্য ইত্যাদি দেখা দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাশি কয়েক সপ্তাহ থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি কুসুম কুসুম গরম পানি পান ও হালকা গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করা উচিত। প্যারাসিটামল ও অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ খেলেই যথেষ্ট। প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে। পাশাপাশি মধু, আদা, তুলসীপাতা, কালিজিরা ইত্যাদি সেবন রোগের উপসর্গকে কমাতে সাহায্য করবে।’
অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাসের পরপরই ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করতে পারে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘কাশির সঙ্গে হলুদ বা সবুজ রঙের কফ বের হলে, সঙ্গে জ্বর থাকলে ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সে ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এ রোগ আবার অন্যদের মাঝেও ছড়ায়। তাই রোগ যাতে অন্যদের আক্রান্ত করতে না পারে, সে লক্ষ্যে আরোগ্য না হওয়া পর্যন্ত ঘরে থাকাই ভালো। বিশেষ করে স্কুলের ছাত্রছাত্রী যারা আক্রান্ত, তাদের অবশ্যই ঘরে থাকা উচিত। নেহায়েত বাইরে যেতে হলে মাস্ক ব্যবহার করা ভালো।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মাস ১০ দিনে ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৯ হাজার ৯২৮ জন। মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। এর মধ্যে পাঁচজন চট্টগ্রামে ও একজন কুমিল্লায়। ডায়রিয়া নিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে ভর্তি হয় ২৮ হাজার ২৫২ জন। এই বিভাগে সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়; ৬ হাজার ৯৯ জন। এরপর চট্টগ্রামে ৫ হাজার ২৫০, কক্সবাজারে ৪ হাজার ৩৫৫, কুমিল্লায় ২ হাজার ৯৩০, চাঁদপুরে ২ হাজার ৭৭৬, নোয়াখালীতে ২ হাজার ৮৬, লক্ষ্মীপুরে ১ হাজার ৫৫৬ জন।
ঢাকা মহানগরে ভর্তি হয় ১৭৭ জন। ঢাকা বিভাগে ১১ হাজার ২৭৯ জন। এই বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নরসিংদীতে ৩ হাজার ৫৪৪ জন। এরপর মাদারীপুরে ২ হাজার ৯৪, শরীয়তপুরে ১ হাজার ৬০৬, টাঙ্গাইলে ১ হাজার ৪ জন। অন্য জেলাগুলোয় তুলনামূলক কম। ময়মনসিংহ বিভাগে ৪ হাজার ৭৯০ জন।
খুলনা বিভাগে ১০ হাজার ৭১৭ জন। বেশি ভর্তি হয়েছে কুষ্টিয়া, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও যশোরে। রাজশাহী বিভাগে ৮ হাজার ৭৪৫ জন। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২ হাজার ১৭৯ ভর্তি হয়েছে। এরপর বেশি ভর্তি হয়েছে পাবনা, নাটোর ও রাজশাহীতে। রংপুর বিভাগে ৫ হাজার ৯৮৯ জন। এই বিভাগে বেশি ভর্তি হয়েছে ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারীতে। সিলেট বিভাগে ৭ হাজার ১৫২ জন। বেশি সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে। বরিশাল বিভাগে ২ হাজার ৮২৭ জন ভর্তি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘শীত এলে বেশ কয়েকটি রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। ছোট এবং বড়দের মধ্যে ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া, ছোটদের মধ্যে ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়া, ঠান্ডা-কাশি, ভাইরাসজনিত উদরাময় রোগ, বমি-পাতলা পায়খানাও হয়। অনেকের মধ্যে চর্মরোগের প্রকোপ দেখা দেয়। এগুলো থেকে রক্ষার জন্য বয়সভেদে কিছু সাবধানতা নিতে হয়। বয়স্করা একটু বেশি শীতের পোশাক পরবেন। ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করবেন না। তরুণ-যুবকদের বলব, তারা যেন ঠান্ডা না লাগে এমন ধরনের পোশাক পরে। বিশেষ করে শিশুদের সাবধানে না রাখলে রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। সেজন্য কোনোভাবেই ঠান্ডা লাগনো যাবে না। দ্বিতীয়ত বাইরে বের হলে পর্যাপ্ত শীতের পোশাক পরতে হবে। শীতকালীন ফলমূল, শাকসবজি পরিমাণমতো খেতে হবে। শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক বলেন, ‘শীতকালে ঠান্ডা কাশি, ডায়রিয়া ও চর্মরোগ হয়। ঠান্ডা-কাশি রোগটি খারাপ। বসে যেতে পারে, তখন হয়তো নিউমোনিয়ায় টার্ন করে। যাদের অ্যাজমা আছে, তাদের শ্বাসকষ্ট হয়। আগে থেকে অন্য কোনো রোগ থাকলে এতে তখন বেশি কষ্ট হয়। যাতে ঠান্ডা না লাগে সেই চেষ্টা করতে হবে। শিশুদের ঘরের বাইরে বের করলে মাথা, হাত-পা ঢেকে মুখে মাস্ক পরে বের করতে হবে। ঠান্ডা লেগে গেলে নাকটা যাতে খোলা থাকে, সেজন্য স্যালাইন ওয়াটার দিয়ে নাক পরিষ্কার করাতে হবে। এখন শিশু হাসপাতালে যত রোগী আসছে, তার ৩০ শতাংশেরই ঠান্ডা-কাশি। ডায়রিয়া হলে স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি স্যালাইন খাবে।’
